সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব      বাতিল হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের ‘বিশেষ সুবিধা’      ভারতের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নতুন নির্দেশনা      ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসির ফল প্রকাশ: শিক্ষামন্ত্রী      দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করে দেশে ফিরলেন তথ্য উপদেষ্টা      দেশে ফিরেছেন ৫৬ হাজারের বেশি হাজি      
ইতিহাস ও এতিহ্য
মিরসরাইয়ের ঢাকি নাটক : লোকনাট্যের ঐতিহ্য, সংকট ও সংরক্ষণের প্রাসঙ্গিকতা
পায়েল বিশ্বাস
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ৯:১৫ পিএম
ছবি পায়েল বিশ্বাস

ছবি পায়েল বিশ্বাস

বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি এক অমূল্য সম্পদ। গ্রামীণ জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই সংস্কৃতি মানুষের আনন্দ-বেদনা, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ ও সম্প্রদায়ের যৌথ স্মৃতিকে প্রতিফলিত করে। যাত্রাপালা, পালাগান, জারি-সারি, গম্ভীরা, আলকাপ ও বাউল গানসহ বিভিন্ন লোকনাট্য ধারার পাশাপাশি চট্টগ্রামের মিরসরাই অঞ্চলে প্রচলিত ‘ঢাকি নাটক’ বা ‘ঢাক বাজানো নাটক’ এক অনন্য আঞ্চলিক রূপ। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক সংহতির প্রতীক।

ঢাকি নাটক মিরসরাইয়ের জনজীবনে গভীরভাবে প্রোথিত। চৈত্র সংক্রান্তি ও বাসন্তী পূজাকে কেন্দ্র করে চৈত্র মাসের শেষ ১৫ দিন ধরে এই নাটকের মহোৎসব চলে। শত বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্য মিরসরাইয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকশিল্পীদের হাত ধরে আজও টিকে আছে। এই ধারাটি বাংলার লোকনাট্যের একটি বিশেষ আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, যা যাত্রাপালার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কিন্তু ঢাকের প্রাধান্য, আঙিনা-কেন্দ্রিক পরিবেশনা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণে সম্পূর্ণ অনন্য।

নাট্যকলার শিক্ষার্থী হিসেবে এই প্রতিবেদনে মিরসরাইয়ের ঢাকি নাটকের নামকরণ ও উৎস, পরিবেশনা শৈলী, বিষয়বস্তু, কুশীলবদের জীবনযাত্রা, আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর টিকে থাকা ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ, সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত। আধুনিক থিয়েটারের যুগে এই লোক-আঙ্গিক কীভাবে গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে টিকে আছে, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কীভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ ও গবেষণার মাধ্যমে এটিকে বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা — এসব বিষয় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের লোকনাট্য ঐতিহ্য মূলত মৌখিক। লিখিত দলিলের অভাব সত্ত্বেও মৌখিক ইতিহাস, স্থানীয় স্মৃতি ও প্রবীণ শিল্পীদের সাক্ষাৎকার থেকে এর গভীরতা উদ্ধার করা যায়। ঢাকি নাটক এই ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যা ধর্মীয় উৎসবের সাথে লোকজীবনের মেলবন্ধন ঘটায়।

আধুনিকায়নের চাপে অনেক লোকনাট্য ধারা হারিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ঢাকি নাটকের মতো ধারাগুলোকে সংরক্ষণ করা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। এই প্রতিবেদন সেই প্রচেষ্টারই একটি অংশ।

নামকরণ ও উৎস : ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি

‘ঢাকি নাটক’ নামকরণের মূলে রয়েছে ঢাক বাদ্যযন্ত্রের কেন্দ্রীয় ভূমিকা। ঢাকের জোরালো আওয়াজ, তার তালে তালে অভিনয়, নাচ এবং সংলাপ এই নাটকের প্রাণ। স্থানীয়ভাবে একে ‘ঢাক বাজানো নাটক’ও বলা হয়। এই নামটি সরাসরি পরিবেশনার মূল বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে। উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট লিখিত দলিল খুব কম পাওয়া যায়। তবে মৌখিক ঐতিহ্য অনুসারে এটি শতাধিক বছরের পুরোনো। চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবের সাথে যুক্ত হয়ে এই ধারা বিকশিত হয়েছে।

চৈত্র মাস বাংলা সনের শেষ মাস। এ সময় প্রকৃতিতে বসন্তের আগমন ঘটে। বাসন্তী পূজা ও সংক্রান্তির উৎসবের মাধ্যমে নতুন বছরের প্রস্তুতি শুরু হয়। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মিরসরাইয়ের গ্রামগুলোতে ঢাকি নাটকের আয়োজন করা হয়। পুরাণকথা অনুসারে, রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনিগুলো এই নাটকের মূল উপজীব্য। রাম-রাবণের যুদ্ধ, কৃষ্ণ-কংসের কাহিনি, দুর্যোধনের অহংকারসহ বিভিন্ন পৌরাণিক উপাখ্যান এতে অভিনীত হয়। সময়ের সাথে সাথে এতে স্থানীয় সামাজিক সমস্যা, হাস্যরসাত্মক উপাদান এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন যুক্ত হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলার লোকনাট্য মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলন, চৈতন্যদেবের প্রভাব ও পুরাণকথার সমন্বয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য — পাহাড়, সমতল ও নদী-নালার মিশ্রণ — সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করেছে। মিরসরাইয়ের সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে এই নাটকের জনপ্রিয়তা এখনও উল্লেখযোগ্য। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

অন্যান্য লোকনাট্যের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ঢাকি নাটক যাত্রাপালার মতো কাহিনিনির্ভর কিন্তু আঙিনা-কেন্দ্রিক এবং ঢাক-নির্ভর। এর মৌখিক প্রকৃতি এটিকে আরও গতিশীল করে। প্রতি বছর শিল্পীরা নতুন নতুন সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গি যোগ করে এর জীবন্ততা বজায় রাখেন। এই নমনীয়তা ঢাকি নাটককে আধুনিক সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

পরিবেশনা শৈলী ও অঞ্চল : আঙিনা নাটকের অনন্যতা

মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ দেওয়ানপুর, সোনাপাহাড়, গোপীনাথপুর, চিনকিরহাট ও আজমনগর গ্রামে ঢাকি নাটকের দলগুলো সবচেয়ে সক্রিয়। এখানকার শিল্পীরা কোনো স্থায়ী আধুনিক মঞ্চের প্রয়োজন বোধ করেন না। তারা পায়ে হেঁটে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে বেড়ান। গ্রামের কোনো অবস্থাপন্ন গৃহস্থের বাড়ির উঠোন বা আঙিনাই হয়ে ওঠে তাদের অভিনয় ক্ষেত্র। চারিদিকে দর্শক গোল হয়ে বসেন এবং মাঝখানে অভিনয় চলে। এই শৈলী আমাদের ঐতিহ্যবাহী ‘আঙিনা নাটক’ বা ‘খুলনাটি’র কথা মনে করিয়ে দেয়।

পরিবেশনা সাধারণত রাতে হয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে শিল্পীরা গ্রামের লোকজনকে জাগিয়ে তোলেন। একেক বাড়িতে একেক অংশ পরিবেশিত হয়। প্রতি রাতে ৪-৫টি বাড়ি ঘোরা হয়। দর্শক-শ্রোতারা সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানান— হাসি, কান্না, উল্লাস বা চিৎকারের মাধ্যমে। এটি সম্প্রদায়ের যৌথ অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। ঢাকের তাল, শারীরিক অঙ্গভঙ্গি, নাচ ও জোরালো সংলাপ এই নাটকের প্রধান আকর্ষণ। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ঢাক ছাড়াও ঢোল, করতাল ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়।

এই আঙিনা-কেন্দ্রিক পরিবেশনা আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে দর্শক এবং অভিনেতার মধ্যে দূরত্ব নেই। দর্শকরা অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠেন। এই ঘনিষ্ঠতা নাটকের আবেগকে আরও তীব্র করে। গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে এই নাটক মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক: পৌরাণিক থেকে সমকালীন

ঢাকি নাটকের মূল কাহিনি রামায়ণ ও মহাভারত থেকে নেওয়া। রামের বনবাস, সীতাহরণ, রাবণবধ, কৃষ্ণের লীলা ইত্যাদি পৌরাণিক উপাখ্যান এতে প্রধান স্থান পায়। তবে সময়ের সাথে সাথে সামাজিক ও হাস্যরসাত্মক উপাদান যুক্ত হয়েছে। বর্তমান সমাজের দারিদ্র্য, শোষণ, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয় স্থানীয় প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়। এতে হাস্যরসের মাধ্যমে সমাজের সমালোচনা করা হয়, যা দর্শকদের মধ্যে চিন্তার খোরাক জোগায়।

আঙ্গিকের দিক থেকে ঢাকের তাল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পীরা ঢাকের সাথে তাল মিলিয়ে নাচেন, অঙ্গভঙ্গি করেন ও সংলাপ বলেন। কোনো লিখিত স্ক্রিপ্ট নেই। সবকিছু মৌখিক ঐতিহ্য ও উন্নয়নশীল। প্রতি পরিবেশনায় নতুনত্ব যোগ হয়। এই নমনীয়তা ঢাকি নাটককে জীবন্ত রাখে।

কুশীলবদের জীবন ও সংকট : অপেশাদার শিল্পীদের নিষ্ঠা

ঢাকি নাটকের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর শিল্পীরা কেউ পেশাদার নাট্যকর্মী নন। তারা মূলত স্থানীয় ছাত্র, শিক্ষক, কাঠমিস্ত্রি, কৃষক বা ছোট ব্যবসায়ী। দিনের বেলা তারা নিজেদের জীবিকার কাজ করেন, আর রাত গভীর হলে ভালোবাসার টানে রূপটান দিয়ে নেমে পড়েন অভিনয়ে। জোরারগঞ্জের দক্ষিণ দেওয়ানপুর গ্রামের হীরালাল দেবনাথের মতো প্রবীণ নির্দেশক ও নিষ্ঠাবান শিল্পীরা এই ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

দর্শকেরা খুশি হয়ে যে চাল, ডাল বা সামান্য প্রণামী দেন, তা দিয়েই নাটকের খরচ চালানো হয়। কিন্তু এই অপেশাদার শিল্পীদের জীবনে নানা সংকট রয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, নতুন প্রজন্মের আগ্রহের অভাব, আধুনিক বিনোদনের প্রতিযোগিতা— এসব কারণে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

আধুনিক থিয়েটারের যুগে টিকে থাকা ও বিলুপ্তির ঝুঁকি

আধুনিক থিয়েটার প্রযুক্তি-নির্ভর, পেশাদার এবং শহুরে। ঢাকি নাটক সম্প্রদায়-কেন্দ্রিক, সাশ্রয়ী এবং গ্রামীণ। এটি লোকমানুষের বিনোদনের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে টিকে আছে। তবে টেলিভিশন, স্মার্টফোন, ইউটিউব ও শহুরে সংস্কৃতির চাপে এটি সংকটে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং কুশীলবদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা এই লোক-আঙ্গিকটিকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ফেলেছে।

এই ধারাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ, গবেষণা, ডকুমেন্টেশন এবং যুব প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য বিভাগ, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সরকারি উদ্যোগ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউনেস্কোর অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে ঢাকি নাটককে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা জরুরি।

উপসংহার

মিরসরাইয়ের ঢাকি নাটক শুধু একটি লোকনাট্য নয়, এটি একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আধুনিক যুগে এর টিকে থাকা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাট্যকলার শিক্ষার্থী ছাড়াও  এই ধারার গবেষণা, প্রচার ও সংরক্ষণ আমাদের সকলের দায়িত্ব। প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। 

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  মিরসরাইয়ের ঢাকি নাটক   লোকনাট্যের ঐতিহ্য   সংকট   সংরক্ষণের প্রাসঙ্গিকতা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

ইতিহাস ও এতিহ্য- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close