ভারতের তামিলনাড়ুর অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর ভেলোরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘ভেলোর দুর্গ’। ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী এবং রাজকীয় স্মৃতির টানে প্রতিদিন ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ও দর্শনার্থী ভিড় জমাচ্ছেন এ দুর্গে।
বিশাল পাথরের প্রাকার ও গভীর জলপরিখা দিয়ে ঘেরা প্রায় ১৩৩ একর (প্রায় ০.৫৪ বর্গকিলোমিটার) বিস্তৃত এ দুর্গ সামরিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। ইতিহাসপ্রেমীদের মূল আকর্ষণ দুর্গটির প্রবেশপথের বিশাল পাথরের ফটক এবং ভেতরে থাকা শত শত বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
দুর্গের ইতিহাস ও টিপু সুলতানের স্মৃতি
ষোড়শ শতকে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের চিন্না বোম্মি নায়ক ও থিম্মা রেড্ডি নায়কের হাত ধরে দুর্গটি নির্মিত হলেও, সময় পরিক্রমায় এটি বিজাপুরের সুলতান, মারাঠা, মহীশূর সাম্রাজ্য এবং সবশেষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে যায়। ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তমের যুদ্ধে মহীশূরের শাসক ‘বীর মহীশূর’ টিপু সুলতানের শাহাদাতের পর ব্রিটিশরা তার পুরো পরিবার ও সন্তানদের এ ভেলোর দুর্গের প্রাঙ্গণেই বন্দি করে রাখে। দুর্গের ভেতরে অবস্থিত ‘টিপু মহল’ ও ‘হায়দার মহল’ এখনও সুলতান হায়দার আলী ও তার পুত্র টিপু সুলতানের স্মৃতি বহন করে চলেছে। ১৮০৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতীয় সিপাহিদের ঐতিহাসিক ‘ভেলোর সিপাহি বিদ্রোহ’ এই দুর্গের প্রাঙ্গণ থেকেই সূচনা হয়েছিল।
জাদুঘরের মূল আকর্ষণ
জাদুঘরটিতে রাখা হয়েছে বিজয়নগর, চোল ও পল্লব রাজবংশের প্রাচীন পাথরের ভাস্কর্য, মধ্যযুগীয় অস্ত্রশস্ত্র, কামান, পুরনো মুদ্রা ও হস্তলিপি। এ ছাড়া টিপু সুলতানের সময়কার বিভিন্ন ব্যক্তিগত স্মারক, চিত্রকর্ম ও মহীশূর রাজপরিবারের নানান দলিলপত্র দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
দুর্গের ভেতরে শুধু ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নই নয়, রয়েছে বিখ্যাত ‘জলকান্টেশ্বর মন্দির’, সেন্ট জন্স চার্চ এবং প্রাচীন মসজিদ। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সব বয়সের মানুষের গমনাগমনে মুখরিত থাকে ভারতের দক্ষিণঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় এই ঐতিহাসিক স্থান।
তামিলনাড়ুর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘ভেলোর দুর্গ’। ইতিহাস, কৌশলগত সামরিক স্থাপত্য এবং রাজকীয় স্মৃতির টানে প্রতিদিন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ও বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটকের আগমন ঘটছে এ প্রাচীন প্রাঙ্গণে।
ইতিহাস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ষোড়শ শতকের শেষভাগে (১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ) বিজয়নগর সাম্রাজ্যের নায়ক শাসক—চিন্না বোম্মি নায়ক ও থিম্মা রেড্ডি নায়কের অধীনে এ দুর্গটি নির্মিত হয়। পরবর্তীতে এটি দক্ষিণ ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সময় পরিক্রমায় দুর্গটি বিজাপুরের সুলতান, মারাঠা সাম্রাজ্য, মহীশূর সাম্রাজ্য এবং সর্বশেষ ১৭৬০-এর দশকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে যায়।
টিপু সুলতানের রাজপরিবার ও বন্দিদশা
১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তমের চতুর্থ চতুর্মুখী যুদ্ধে মহীশূরের শাসক, ‘মহীশূর-শার’ নামে পরিচিত সুলতান ফাতেহ আলী টিপু (টিপু সুলতান) শাহাদাত বরণ করেন। তার পতনের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি টিপু সুলতানের পুত্রদের (যেমন—শাহজাদা মুইজউদ্দিন, ইয়াসিন, মুইজ-উদ-দ্বীন প্রমুখ) এবং তার সমগ্র পরিবারকে এই ভেলোর দুর্গে কড়া নিরাপত্তায় বন্দি করে রাখে। দুর্গের ভেতরে থাকা ‘টিপু মহল’ ও ‘হায়দার মহল’ আজও মহীশূর রাজপরিবার ও সুলতান হায়দার আলীর ঐতিহাসিক স্মৃতি বহন করছে।
১৮০৬ সালের ঐতিহাসিক ভেলোর সিপাহি বিদ্রোহ
১৮৫৭ সালের বিখ্যাত সিপাহি বিদ্রোহের প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে, ১৮০৬ সালের ১০ জুলাই এ ভেলোর দুর্গের ভেতরেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত ভারতীয় ভারতীয় সিপাহি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। টিপু সুলতানের রাজপুত্রদের উপস্থিতিতে ভারতীয় সিপাহিরা দুর্গ দখল করে মহীশূরের রাজকীয় রয়্যাল ফ্ল্যাগ (বাঘের চিহ্নযুক্ত পতাকা) উত্তোলন করেছিলেন। যদিও ব্রিটিশরা দ্রুত কঠোর হাতে এ বিদ্রোহ দমন করে, তবুও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ভেলোর দুর্গ এক অনন্য স্থান দখল করে আছে।
স্থাপত্যশৈলী ও প্রধান আকর্ষণসমূহ
ভোলোর দুর্গটি গ্রানাইট পাথরের বিশাল খণ্ড দিয়ে তৈরি। দুর্গের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর চারপাশের বিশাল জলপরিখা, যা এককালে হাজার হাজার কুমিরে পূর্ণ থাকত এবং দুর্গকে যেকোনো আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিত। দুর্গের ভেতরে বিভিন্ন ধর্মের ও সংস্কৃতির সহাবস্থান দেখা যায়।
জলকান্টেশ্বর মন্দির
বিজয়নগর স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন, যার খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ ও গোপুরাম দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
টিপু মহল ও হায়দার মহল
মহীশূর রাজপরিবারের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক ভবনসমূহ। সেন্ট জন্স চার্চ ও মসজিদ: দুর্গের ভেতরে অবস্থিত ব্রিটিশ আমলের চার্চ এবং প্রাচীন ইসলামিক স্থাপত্যের মসজিদ রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক মিউজিয়াম ও দর্শনার্থীদের তথ্য
ঐতিহাসিক এ দুর্গের মূল চত্বর ও প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য দর্শনার্থীদের কোনো প্রবেশ ফি দিতে হয় না। তবে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ASI) দ্বারা পরিচালিত দুর্গের অভ্যন্তরীণ মিউজিয়ামে (জাদুঘর) প্রবেশের জন্য প্রতি ভারতীয় নাগরিকের ক্ষেত্রে মাত্র ১০ রুপি প্রবেশ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে (বিদেশি পর্যটকদের জন্য আলাদা ফি প্রযোজ্য)।