‘ডেউয়ার ডালে শৈশব ঝুলে, মাটির গন্ধ মেশে, হারিয়ে যাওয়া বাংলার স্বাদ ফিরে আসে তার রসে’ ডেওয়া একটি দেশীয় ঐতিহ্যবাহী ফল যা অঞ্চলভেদে ডেউয়া, ডেওফল বা বনকাঁঠাল নামেও পরিচিত।
একসময় মাগুরার শালিখা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে ডেওয়া, গাব, কাম,ডুমুর, আতা, মেওয়াসহ দেশীয় নানা ফল ছিল প্রকৃতির এক অমূল্য উপহার। ঋতুভেদে গাছভরা ফলের সমারোহে মুখর হয়ে উঠত গ্রামের পথঘাট, বাড়ির আঙিনা ও বাগান। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক ফলের চাহিদা ও নগরায়ণের প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক দেশীয় ফল।
সেই হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী ফলের তালিকায় রয়েছে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ‘ডেওয়া’। দুই দশক আগেও গ্রাম বাংলার মেঠোপথ ধরে হাটলে বাতাসে ভেসে আসত এক চেনা টক-মিষ্টি সুবাস। গাছের ডালে ডালে ঝুলতে দেখা যেত হলদেটে, এবড়ো-থেবড়ো এক অদ্ভুত আকৃতির ফল। গ্রামীণ জনপদের অতি পরিচিত ও শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সেই ফলটির নাম ‘ডেউয়া’।
স্থান বা অঞ্চলভেদে এটি ঢেউয়া, মাদার, ডেউফল, বার্তা, দালো, বনকাঁঠাল, ডয়ো কিংবা ডহুয়া নামেও পরিচিত। অযত্ন-অবহেলায় প্রাকৃতিকভাবেই এই গাছটি চারদিকে জন্মায়। শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট বড় গাছ। পাতা বড়, গোল, ৬-১২ ইঞ্চি লম্বা ও ৪-৭ ইঞ্চি চওড়া, খসখসে। বৃন্ত লম্বা। ফুল দুই রকম_ স্ত্রী ও পুরুষ। ফল কাঁচা অবস্থায় লালচে, পাকা অবস্থায় পীত রঙ।
কিন্তু কালের বিবর্তনে, জলবায়ুর পরিবর্তন আর নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে পুষ্টিগুণে ঠাসা এই দেশি ফলটি আজ বিপন্ন ও বিলুপ্তির পথে। গ্রামের বন-জঙ্গল ধ্বংস হওয়ার কারণে এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না এই বন কাঠাল বা ডেউয়া ফল। শহরাঞ্চলে তো এটি এখন রীতিমতো এক ‘দুর্লভ’ ফল। তবে মাগুরার শালিখার উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে এখনো টিকে আছে কিছু ডেউয়া গাছ। ফলটির মৌসুম চলায় স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে গ্রামীণ এই ফলের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।
ডেউয়া ফল দেখতে কিছুটা কাঁঠালের মতো হলেও এর স্বাদ ও গন্ধ আলাদা। পাকলে ফলের ভেতরের অংশ হলুদাভ রঙ ধারণ করে। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল এক সময় গ্রামের মানুষের কাছে ছিল বেশ জনপ্রিয়। কাঁচা অবস্থায় লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া হতো, আবার পাকা ডেউয়া দিয়ে তৈরি করা হতো আচার, চাটনি ও বিভিন্ন মুখরোচক খাবার।
গ্রামবাংলার শৈশবের স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ডেউয়া। গাছ থেকে পাকা ফল পড়ে গেলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে শুরু হতো কুড়ানোর আনন্দ। বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়ার সেই দিনগুলো এখন অনেকের কাছেই শুধুই স্মৃতি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন এই ফলের নাম পর্যন্ত জানে না।
ডেউয়া হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো দেশীয় গাছের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়া। বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশ ও পতিত জমিতে আগে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠত এই গাছ। বর্তমানে সেখানে তৈরি হচ্ছে বসতঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা চাষাবাদের নতুন পরিকল্পনা। ফলে কমে যাচ্ছে ডেউয়া গাছের সংখ্যা বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বাণিজ্যিকভাবে এই ফলের চাষ না হওয়ায় কৃষকরাও ডেউয়া গাছ লাগাতে আগ্রহী হচ্ছেন না। বাজারে বিদেশি ও আধুনিক জাতের ফলের আধিক্যের কারণে দেশীয় অনেক ফল মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
পুষ্টিগুণের দিক থেকেও ডেউয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ফল। চিকিৎসকরা বলছেন, ডেউয়া ফল ভিটামিন ‘বি’, ‘সি’, ‘ক্যালসিয়াম’, ‘পটাশিয়াম’, ‘ফাইবার’, ‘লৌহ’ এবং ‘জিংক’-এর মতো শরীরের জন্য অপরিহার্য উপাদানে ভরপুর। একটি মাঝারি আকৃতির ডেউয়া ফল থেকে প্রায় ৭৩ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়।
এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে দারুণ কাজ করে। অরুচি ও পেটের বায়ুনাশে ডেউয়া এক অমৃত ফল ডেওয়া। পাকলে ডেউয়া মধুর অমস্নরসযুক্ত হয়। কাঁচা ডেউয়া টক, ক্ষুধা দূর করে। পাকা ফল ক্ষুধাবর্ধক হয়। আবার পাকা ডেউয়া পিত্ত ও যকৃতের উপকারী। ডেউয়া বেশি খেলে ক্লীবতা আনে। এতে রয়েছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান। সহজলভ্য ও প্রাকৃতিক এই ফল একসময় গ্রামীণ মানুষের মৌসুমি পুষ্টির অন্যতম উৎস ছিল।
দেশীয় ফলের ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বাড়ির আঙিনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তার পাশে ও সরকারি জায়গায় ডেউয়া গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কৃষকদের উৎসাহিত করা গেলে এই ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
ডেউয়া শুধু একটি ফল নয়, এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। প্রকৃতির এই উপহারকে সংরক্ষণ করা না গেলে একদিন নতুন প্রজন্মের কাছে ডেউয়ার পরিচয় হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই দেশীয় ফলের বৈচিত্র্য রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
কেকে/ এমএস