সময়ের পরিক্রমায় কালের বিবর্তনে ও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাহন বিয়ের পালকি আজ প্রায় বিলুপ্ত। একসময় বিয়ে মানেই ছিল পালকির ছড়াছড়ি ও বরযাত্রীদের পদচারণা, যা এখন শুধুই কেবলই স্মৃতি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যাতায়াত ব্যবস্থার বিকাশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তেমনি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত কিছু উপকরণ আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে আছে। তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম হলো পালকি। সময়ের স্রোতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই পালকি এক সময় ছিল বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অপরিহার্য একটি অংশ।
জানা গেছে, অবিভক্ত চকরিয়া উপজেলায় এক সময় গ্রামের প্রত্যন্তঞ্চলে গ্রাম বাংলার বিয়ে বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল পালকি। বাঁশের তৈরি এই বাহনটি কাঁধে বহন করতেন চারজন প্রশিক্ষিত বেহারা। বেহারারা যখন পালকি নিয়ে চলতেন, তখন তাদের ছন্দের তালে তালে গান ও হাঁকডাক এক নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করত। আধুনিক যানবাহনের প্রসার, সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, ও অটোরিকশার সহজলভ্যতা ব্যবস্থার কারণে পালকির ব্যবহার আজ প্রায় বিলুপ্তি বললে চলে।
পালকি বহন করার জন্য ৪ থেকে ৬ জন যে ‘বেহারা’ লাগতো তা আধুনিক যুগের ব্যস্ততায় এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পালকি তৈরি করার মতো দক্ষ কারিগর বা কাঠমিস্ত্রি এখন আর নেই বললেই চলে।
গ্রামীণ জনপদে আধুনিক যানবাহনের আগমনের বহু আগে থেকেই পালকি ছিল সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। কাঠ ও বাঁশের তৈরি কাঠামো, উপরে কাপড়ের ছাউনি, ভেতরে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে পালকি ছিল মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক। সাধারণত চারজন বলিষ্ঠ বেহারা কাঁধে তুলে ধরত পালকি। তারা একসঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটত, গাইত ছন্দময় গান, যা পথের পরিবেশকে করে তুলত আনন্দমুখর।
চকরিয়ার প্রবীণ সিনিয়র সাংবাদিক এম আর মাহমুদ বলেন- আজ থেকে ২৫-৩০ বছর পূর্বেও বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানেও চকরিযার জনপদের বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে পালকি ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। গ্রামীণ বিয়ে বাড়িতে বর-কনে যাত্রীদের আনায়ন করতে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পালকিতে চড়ে বর-কনের আগমন হতো। বরযাত্রীরা হেঁটে যেত, আর পালকিতে বসে বর আসত কনের বাড়ি।
বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত পরিবারের কনে বা গৃহবধূদের বাইরে যাতায়াতেও পালকির ব্যবহার ছিল। সামাজিক শালীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নারীদের জন্য পালকি ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত বাহন। তখনকার দিনে গ্রামঞ্চলের রাস্তা-ঘাট ছিল কাঁদা মাটির। পায়ে হেঁটে যেতেও মানুষের কষ্ট হতো। মূলত বিয়ের কনে বিদায়ের সময় এবং দুর্গম পথে যাতায়াতের জন্য পালকির ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। সময়ের পরিক্রমায় আজ পালকির ব্যবহার বিলুপ্ত প্রায়।
মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের প্রবীণ শিক্ষক মাস্টার গোলাম ছোবহান জানান, শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিয়ে বাড়িতে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই পালকি। প্রযুক্তির অগ্রগতি ও কালের পরিক্রমায় যানবাহনের সহজলভ্যতা পালকির জায়গা দখল করে নেয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ব্রান্ডের গাড়ি। যা নোহা, কার, মাইক্রোবাস, ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা, মোটরগাড়ি—সবকিছু ধীরে ধীরে পালকির প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়। দিন পরিবর্তনের সাথে সাথে এক সময় এই ঐতিহ্য সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যেতে থাকে। পালকি আমাদের ইতিহাসের এক গর্বিত অধ্যায়—যা অতীতকে ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সংস্কৃতির শিকড়ে ফিরে যেতে অনুপ্রাণিত করে। পালকি আজ শুধু এক প্রজন্মের স্মৃতিতে নয়, এটি হয়ে উঠেছে আমাদের লোক ঐতিহ্যের এক মূল্যবান দলিল।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পালকির বিয়ে সম্পর্কে জানতে চাইলে কর্মজীবী জেবুন্নেছা জামান বলেন, শিশুকাল থেকে দাদি-নানির মুখ থেকে পালকিতে বিয়ের গল্প শুনে এসেছি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই পালকিতে চড়ে যে বিয়ে হয়েছিল, সে সম্পর্কে কোন ধরণের ধারণাও নেই। গ্রামবাংলার পালকি বিয়ের ঐতিহ্যে এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে গ্রামের কোথাও পালকি চড়ে বিয়ে এমন সচারাচর দৃশ্য চোখে পড়েনি। গ্রামবাংলার চিরায়ত এই ঐতিহ্য যেন বাংলার ঘরে ঘরে নতুন করে ফিরে আসে এটাই আমরা চাই।
পালকি চড়ে শ্বশুর বাড়িতে আসা উপজেলার দক্ষিণ বহদ্দারকাটা এলাকার ৮০ বছরের বয়োবৃদ্ধা আয়েশা বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া তার জীবনের রোমাঞ্চকর স্মৃতির কথা জিজ্ঞেস করতেই ফেলে আসা বহু অনুভূতির কথা তুলে ধরেন। বাবা-মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতেই খুবই অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছে। সাংসারিক জীবন কি তেমন ভালো ভাবে বুঝে উঠার সক্ষমতাও হয়নি। সময় যতই গড়িয়ে যায় ততই সংসার জীবন সম্পর্কে আস্তে আস্তে ধারণা করতে শিখি। যখন বিয়ের সময় ঘনিয়ে আসে, ঠিক বিয়ের দুইদিন আগে থেকে বর-কনের বাড়িতে নানা ধরনের বিয়ের অনুষ্টান শুরু হয়। বিয়েতে গ্রামবাসী ও আত্মীয়স্বজন এসে ভীড় জমে যেতো। নানা আয়োজনে আনন্দ উল্লাসে বিয়ে সুসম্পন্ন হয়। ডেমুশিয়া থেকে কাঁদা মাটির রাস্তা দিয়ে পালকিতে চড়ে শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে–তখন আশপাশের লোকজন গ্রামীণ পরিবেশে মানুষেরা পালকি চড়ে বউ নিয়ে যাচ্ছেন এমন শব্দ শুধু পালকির ভেতরে শুনেছি। সত্যি এটি জীবনের এক অনূভুতি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মৃতি।
কেকে/ এমএস