মালচিং পদ্ধতিতে অসময়ে তরমুজ চাষ, পাকুন্দিয়ায় কৃষকদের নতুন সম্ভাবনা
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৬:২০ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি
গ্রীষ্মের অন্যতম জনপ্রিয় ও রসালো ফল তরমুজ। প্রচণ্ড গরমে শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে এ ফলের জুড়ি নেই। প্রায় ৯০ শতাংশ পানি সমৃদ্ধ তরমুজে রয়েছে ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘সি’, পটাশিয়াম, খাদ্য আঁশ এবং শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট লাইকোপিন, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাধারণত চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত দেশের বাজারে তরমুজের সরবরাহ বেশি থাকে। তবে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে এখন আর তরমুজ শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালীন ফল নয়; বছরের অন্যান্য সময়েও বাণিজ্যিকভাবে এ ফল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষ করে মালচিং, মাচা পদ্ধতি, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তার সমন্বয়ে বর্ষা মৌসুমেও সফলভাবে তরমুজ উৎপাদন করছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা। সেই ধারাবাহিকতায় কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় অফ-সিজনের তরমুজ চাষ কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
কয়েক বছর আগেও বর্ষাকালে যেসব জমি জলাবদ্ধতার কারণে অনাবাদি পড়ে থাকত, বর্তমানে সেই জমিতেই উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের সুস্বাদু তরমুজ। একজন কৃষকের সফল উদ্যোগ এখন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। তার দেখাদেখি অনেক কৃষক ধানসহ প্রচলিত কম লাভজনক ফসলের পরিবর্তে অসময়ের তরমুজ চাষে ঝুঁকছেন।
পাকুন্দিয়া উপজেলার চন্ডিপাশা ইউনিয়নের ঘাগড়া গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বর্তমানে এ এলাকার অফ-সিজনের তরমুজ চাষের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। কয়েক বছর ধরে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে মালচিং ও মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে ধারাবাহিকভাবে সফলতা অর্জন করছেন। প্রথমদিকে স্বল্প পরিসরে শুরু করলেও এখন তিনি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন। গত বছর মাত্র ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ জমিতে তরমুজ আবাদ করে প্রায় ৯০ থেকে ৯২ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করেন। সেই সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় ৮২ থেকে ৮৪ শতাংশ জমিতে অফ-সিজনের তরমুজ চাষ করেছেন।
বর্তমানে তার ক্ষেতজুড়ে ঝুলছে শত শত বড় আকৃতির তরমুজ। প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, ফলচাষি এবং সাধারণ মানুষ তার ক্ষেত দেখতে আসছেন। অনেকে সরাসরি মাঠে এসে চাষাবাদের কৌশল, মালচিং প্রযুক্তির ব্যবহার, মাচা তৈরির পদ্ধতি, পরিচর্যা, রোগবালাই দমন, উৎপাদন ব্যয় এবং সম্ভাব্য লাভ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন। ফলে তার ক্ষেত এখন অনেকটা কৃষকদের জন্য একটি উন্মুক্ত শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মালচিং পদ্ধতিতে অসময়ে তরমুজ চাষ
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো জমিতে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি অনুসরণ করে মালচিং পলিথিন বিছানো হয়েছে। প্রতিটি সারির ওপর বাঁশ ও দড়ি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে শক্তপোক্ত মাচা। সেই মাচাজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে সবুজ লতা। লতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে অসংখ্য সবুজ ডোরাকাটা তরমুজ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন সবুজের বুকে ঝুলছে শত শত ফলের মালা। প্রতিটি গাছে তিন থেকে চারটি করে তরমুজ রয়েছে এবং প্রতিটির ওজন প্রায় চার থেকে পাঁচ কেজি। ভারী ফলের চাপ সামলাতে প্রতিটি তরমুজ আলাদা করে জালি বা নেট দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, যাতে ঝড়-বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত ওজনের কারণে ফল ছিঁড়ে পড়ে নষ্ট না হয়।
ক্ষেতজুড়ে রয়েছে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। কোথাও আগাছার অস্তিত্ব নেই। মালচিং পলিথিন ব্যবহারের ফলে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকছে, আগাছা জন্মাতে পারছে না এবং সারের অপচয়ও কম হচ্ছে। একই সঙ্গে বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি সরাসরি গাছের গোড়ায় জমে না থাকায় গোড়া পচা রোগের ঝুঁকিও কমে গেছে। নিয়মিত সেচ, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিটি গাছ সুস্থ ও সবলভাবে বেড়ে উঠেছে। অধিকাংশ তরমুজ ইতোমধ্যে পরিপক্ব হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বাজারজাত করা হবে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা সম্ভব হয়, আগাছা কম জন্মায়, সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং অতিরিক্ত পানি জমে গাছের গোড়া পচে যাওয়ার আশঙ্কা কমে। অন্যদিকে মাচা পদ্ধতিতে লতা ওপরে ওঠানো হলে ফল মাটির সংস্পর্শে আসে না। ফলে ছত্রাকজনিত রোগ, পচন ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে ফলের আকার, রং, স্বাদ ও গুণগত মান ভালো থাকে এবং বাজারে বেশি দাম পাওয়া যায়।
জানা গেছে, এ পদ্ধতিতে চারা রোপণের মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যেই তরমুজ সংগ্রহ করা যায়। বর্ষাকালে সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা, মালচিং এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে মৌসুমের বাইরেও বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ উৎপাদন সম্ভব। বর্তমানে বাজারে অফ-সিজনের তরমুজের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় এর চাহিদা ও দাম দুটোই বেশি। ফলে কৃষকরা মৌসুমের তুলনায় অনেক ভালো মূল্য পাচ্ছেন। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, এ কারণেই ধানসহ তুলনামূলক কম লাভজনক ফসলের পরিবর্তে কৃষকরা এখন লাভজনক বিকল্প ফসল হিসেবে অসময়ের তরমুজ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
কৃষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, “গত বছর ১৭-১৮ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করে প্রায় ৯০ থেকে ৯২ হাজার টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার প্রায় ৮২ থেকে ৮৪ শতাংশ জমিতে চাষ করেছি। এতে আমার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এক সপ্তাহের মধ্যেই তরমুজ বিক্রি শুরু করব। বর্তমানে প্রতি কেজি প্রায় ৫০ টাকা দাম পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে বলে আশা করছি। খরচ বাদ দিয়েও ২ লাখ টাকার বেশি লাভ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি ধাপে ধাপে তিনটি প্লটে তরমুজ চাষ করেছি। এক প্লটের তরমুজ বিক্রি শেষ হলে পাশের জমিতে আবার নতুন করে চাষ করব। বর্ষাকালে এ জমিতে ধান চাষ করা সম্ভব হয় না। তাই মাচা তৈরি করে তরমুজ চাষ করছি। প্রতিটি তরমুজ নেট দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, যাতে পড়ে নষ্ট না হয়। আমার সফলতা দেখে আশপাশের অনেক কৃষক এখন তরমুজ চাষ শুরু করেছেন। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আমার ক্ষেত দেখতে আসছেন এবং চাষাবাদের বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইছেন।”
একই গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, “আমি তরমুজ চাষে নতুন। আলাউদ্দিন কাকাসহ এলাকার কয়েকজন কৃষকের সফলতা দেখে আমিও প্রায় এক বিঘা জমিতে অফ-সিজনের তরমুজ চাষ করেছি। আগে এই জমিতে ধান চাষ করতাম, কিন্তু ধানে উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ খুবই কম। তাই বেশি লাভের আশায় তরমুজ, শসাসহ লাভজনক ফসলের চাষে ঝুঁকেছি। আশা করছি ভালো ফলন ও ন্যায্য দাম পেলে লাভবান হতে পারব।”
আরেক কৃষক রতন বলেন, “ধান চাষ করে এখন আর তেমন লাভ হচ্ছে না। বৃষ্টি-বাদলের কারণে অনেক সময় উৎপাদনও কমে যায়। পাশের কৃষকদের অফ-সিজনের তরমুজ চাষে ভালো ফলন ও লাভ হতে দেখে আমিও আগ্রহী হয়েছি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও উন্নতমানের বীজ নিয়ে এবার তরমুজ চাষ শুরু করার পরিকল্পনা করেছি। আশা করছি এতে ভালো লাভবান হতে পারব।”
সাবেক ইউপি সদস্য ফরিদ উদ্দীন বলেন, “আলাউদ্দিন প্রতি বছরই অফ-সিজনে তরমুজ চাষ করে ভালো ফলন ও লাভ পাচ্ছেন। তার সফলতা দেখে এলাকার অনেক কৃষকও এ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সরকার ও কৃষি বিভাগ যদি উন্নত বীজ, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং সহযোগিতা দেয়, তাহলে আরও অনেক কৃষক তরমুজ চাষ করে লাভবান হতে পারবেন। এতে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি দেশেও মৌসুমের বাইরে তরমুজের সরবরাহ নিশ্চিত হবে।”
কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের এলাকার উৎপাদিত তরমুজ খুবই সুস্বাদু ও মিষ্টি। আমরা নিজেরা যেমন খাই, তেমনি আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতেও উপহার হিসেবে পাঠাই। মৌসুমের বাইরে উৎপাদিত হওয়ায় বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। ধানসহ অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় তরমুজ চাষে লাভও বেশি। তাই এখন অনেক কৃষক এই ফসলের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।”
ঘাগড়া ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “কৃষি বিভাগের উদ্যোগে এ ব্লকে ২০ শতাংশ জমিতে একটি তরমুজ প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি চারা রোপণ করা হয়েছে। আগে এ জমিতে ধান চাষ হলেও লাভ কম ছিল। কৃষক আলাউদ্দিনকে অফ-সিজনের তরমুজ চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়। বর্তমানে তিনি সফল হয়েছেন। তার সফলতা দেখে অনেক কৃষক কৃষি অফিসে যোগাযোগ করছেন এবং এ চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।”
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূরে-আলম বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ঘাগড়া ও চন্ডিপাশা এলাকায় ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছিল। এসব প্রদর্শনী সফল হওয়ায় আশপাশের কৃষকরাও এ চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।
তিনি বলেন, “প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা হলেও ফসল বিক্রি করে এক লাখ টাকার বেশি আয় করা সম্ভব। ফলে কৃষকরা প্রতি বিঘায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেন। মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ দিনের মধ্যেই এই লাভ পাওয়া যায়।”
তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে গাছের গোড়া পচা রোগ প্রতিরোধে মালচিং পেপার অত্যন্ত কার্যকর। পাশাপাশি উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন, জমি প্রস্তুত, রোগবালাই দমন, সারের সঠিক ব্যবহার এবং স্প্রে শিডিউল সম্পর্কে কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ব্ল্যাক কুইন, জামালপুর সিডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অফ-সিজনের মানসম্মত বীজ ব্যবহার করে কৃষকরা ভালো ফলন পাচ্ছেন।
তিনি জানান, অসময়ের তরমুজ চাষের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন শিমসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক ফসলের আবাদ সম্প্রসারণেও কৃষি বিভাগ কাজ করছে। অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে কৃষকদের সারা বছর আয় নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ধানসহ প্রচলিত ফসলের কম লাভজনক অবস্থার কারণে কৃষকরা এখন বিকল্প উচ্চমূল্যের ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি বিভাগের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা এবং বাজারে অফ-সিজনের তরমুজের ভালো দাম অব্যাহত থাকলে পাকুন্দিয়ার এই উদ্যোগ শুধু কিশোরগঞ্জের কৃষিতেই নয়, দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এটি ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকদের জন্যও একটি অনুসরণযোগ্য সফল মডেল হয়ে উঠতে পারে।