কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রামে এক ভিন্নধর্মী কৃষি উদ্যোগের নজির স্থাপন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা ও মাদ্রাসা শিক্ষক হাফেজ মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম। মরুভূমির প্রাণী হিসেবে পরিচিত দুম্বা লালন-পালনের মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যেই এলাকায় সৃষ্টি করেছেন ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল। ২০২৩ সালে ছোট পরিসরে মাত্র ২টি দুম্বা নিয়ে শুরু হওয়া এই খামারে বর্তমানে দুম্বার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টি। এখানে শুধু তুর্কি জাতের দুম্বা পালন করা হচ্ছে। চলতি বছরের মে-জুন মাসে দুই লাখ, দেড় লাখ ও এক লাখ টাকা দরে ৩টি দুম্বা বিক্রি করেছেন তিনি। দুম্বার ক্রেতাদের বেশির ভাগই কুষ্টিয়া জেলার বাইরের মানুষ। দুম্বা পালন তুলনামূলক সহজ হওয়ায় এখনই বিক্রি না করে প্রজননের মাধ্যমে সংখ্যা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এই খামারে।
রাইয়ান বিন রাকিব দুম্বা খামারের মালিক হাফেজ মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাত্র তিন মাস বয়সী একটি দুম্বার দাম এক লাখ টাকা। অথচ একই বয়সী উন্নত জাতের একটি ভেড়ার দাম সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ভেড়ার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয় মরুর দেশের প্রাণীটি। এক বছর বয়সী একটি দুম্বার ওজন সাড়ে তিন মণ পর্যন্ত হয়। তখন সেটি তিন লাখ টাকা বা এর বেশি দামে বিক্রি করা যায়। দুম্বা পালন এখন কঠিন কিছু নয়। দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিচ্ছে এই প্রাণী। ঘাস, খড় ও দানাদার খাদ্যেই বেড়ে উঠছে প্রাণীগুলো। রোগবালাইও তুলনামূলক কম। ফলে দুম্বা পালনে লাভের সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
দুম্বা নিয়ে এক সম্ভাবনাময় উদ্যোগে দেশীয় পরিবেশে বিদেশি প্রজাতির এ প্রাণী লালন-পালন সহজ নয়। তবে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে রাকিবুল ইসলাম সফলতার পথে এগিয়ে চলেছেন।
সরেজমিনে খামার ঘুরে দেখা যায়, বিশাল খামারের এক পাশে টিনশেডের একটি বড় ঘর তৈরি করা হয়েছে। অনেকটা মাচার মতো উঁচু করে বানানো সেই ঘরের এক পাশে মা দুম্বাসহ ৩টি বাচ্চা দুম্বা এবং অন্য পাশে রাখা হয়েছে ১টি বড় পাঠা দুম্বাসহ ১১টি দুম্বা। চারপাশ ঘেরা থাকলেও দুম্বাগুলো সেখানে স্বাভাবিকভাবেই ছোটাছুটি করছে। পরিপাটি পরিবেশে যত্নের সঙ্গে লালন করা হচ্ছে প্রতিটি দুম্বা। নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা—সবকিছুতেই রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। স্থানীয়দের অনেকেই প্রতিদিন খামারটি দেখতে আসেন, নতুন এই প্রাণী সম্পর্কে জানতে চান এবং অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন এমন উদ্যোগে যুক্ত হতে। দুম্বা পালনে রোগবালাই কম ও লাভ বেশি হওয়ায় অনেক তরুণ উদ্যোক্তা অনুপ্রাণিত হয়ে এ ধরনের খামারে যুক্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন প্রজাতির পশুপালন গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে পারে এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ধরনের উদ্যোগ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
সাহেবনগরের এই দুম্বা খামার এখন শুধু একটি খামার নয়, বরং স্বপ্ন দেখার এক অনন্য উদাহরণ। মরুভূমির দুম্বা আজ কুষ্টিয়ার সবুজ প্রান্তরে নতুন সম্ভাবনার গল্প বলছে, যেখানে সাহস, শ্রম আর উদ্ভাবনী চিন্তার মিলনে গড়ে উঠছে সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কেকে/এলএ