মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের সরিয়া গ্রামের টিলার ওপর গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী ফলের বাগান। শিক্ষক রেজাউল করিম খন্দকারের শখের এই বাগানে দেশি-বিদেশি ৫০টিরও বেশি জাতের আমগাছ রয়েছে। চলতি মৌসুমে এর মধ্যে প্রায় ৩৭ জাতের আমগাছে থোকায় থোকায় ফল ধরেছে। নানা রং, আকার ও স্বাদের এসব আম দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাগানের আমগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি রয়েছে বিরল সব জাতের সংগ্রহ। আলফানসো, আমেরিকান কেন্ট, হিমসাগর, চেংমাই, পাকিস্তানি চোষ, আমেরিকান পালমা, সামার বেহেস্ত, সূর্য ডিম, নাচ-১, নাচ-২, নাচ-৩, বৈশাখী, বান্দি নুড়ি, গৌরমতি, কটিমন, থাই কাছা মিটা, কুনাই, বাউ-৩, বারি-১১, নাম ডকমাই, হাড়িভাঙ্গা, ব্ল্যাকস্টোন, মহাচনক, কিউজাই, ব্রুনাই কিং, ব্যানানা, আম্রপালি, হানিডিউ, বারি-৪, ঝাই সাই, ন্যাম ডকমাই ইয়েলো, ন্যাম ডকমাই মুন, সীতাভোগ, অম্বিকা, ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড, অস্টিন, সাদা পুনাই, সি-মুয়াং ও সারেংগাসহ অসংখ্য জাতের আম এবার ফল দিয়েছে।
শুধু আম নয়, বাগানজুড়ে রয়েছে ২০ জাতের আঙুর, ১০ জাতের কমলা, ৭ জাতের ড্রাগন ফল, আফ্রিকান পিচ, তুর্কি মালবেরি, রামবুটান, ফিলিপাইন আখ, মিরাকেল বেরি, লুকাট, ত্বীন, সালাক, পার্সিমন, কাজুবাদাম, শরিফা, আতাফল, মালটা, নাশপাতি, ব্রাজিলিয়ান পেয়ারা, ব্ল্যাকবেরি, রোজ জাম, হানি কুমকোয়াটসহ অসংখ্য বিদেশি ফলের গাছ। বিশেষ আকর্ষণ ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা ‘হানি কাপোর্ড’ ও ‘চুপাচোপা’ ফল। রেজাউল জানান, হানি কাপোর্ড দেখতে অনেকটা লিচুর মতো হলেও পাকলে জেলির মতো হয়ে যায়। অন্যদিকে চুপাচোপা মিষ্টি স্বাদের জন্য বিশেষ পরিচিত।
বাগানের একাংশে পরিবারের চাহিদা মেটাতে বিট, চাইনিজ গাজর, কালো টমেটো, লাল মুলা, স্ট্রবেরি টমেটো, চেরি টমেটো, ক্যাপসিকাম ও বিভিন্ন জাতের মরিচও চাষ করা হচ্ছে।
রেজাউল করিম জানান, ২০১৭ সালে শখের বশে দেশ-বিদেশ থেকে আমের চারা সংগ্রহ করে বাগান শুরু করেন। বর্তমানে এটি দুই একর জমিতে বিস্তৃত। তিনি ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চারা এনে সংগ্রহ সমৃদ্ধ করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও নতুন জাত যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ খরার কারণে এবার কিছু আম ঝরে পড়েছে। খরার সময় সেচের মোটর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুই দিন পানি দিতে না পারায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। এরপরও নাচ-১, নাচ-৩, সামার বেহেস্ত, আমেরিকান কেন্ট ও আমেরিকান পালমা জাতের ভালো ফলন হয়েছে। ব্যানানা জাতের একটি গাছে প্রায় ২০০টি আম ধরেছিল।’
ব্রুনাই কিং জাতের একটি আম ইতোমধ্যে প্রায় দুই কেজি ওজন হয়েছে, যা পাঁচ কেজি পর্যন্ত হতে পারে বলে রেজাউল করিম আশা করছেন।
রেজাউল করিম জানান, তিনি কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। নিজেই জৈব সার তৈরি করে গাছে প্রয়োগ করেন। তার বাগানের উদ্দেশ্য বিষমুক্ত ফল উৎপাদন, পরিবারের চাহিদা পূরণ এবং দেশের মানুষের কাছে বিদেশি ফলের পরিচিতি বাড়ানো। তিনি এসব ফল বিক্রির চেয়ে আত্মীয়স্বজন ও অতিথিদের উপহার দিতেই বেশি আনন্দ পান।
বড়লেখা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গত সপ্তাহেও আমি ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম। এবার মোটামুটি ফলন ভালো হয়েছে। আমের অনেক ধরনের ভেরাইটি আছে। কোনো জাতের ভালো হয়েছে, কোনো জাতের কিছুটা কম। ফলন খুব ভালো না, আবার একেবারে খারাপ না। উনি তো শুধু বাংলাদেশ না বাইরের অনেক দেশ থেকে আমের জাত, চারা এনেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশি জাতের চারা সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণে রেজাউল করিমের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি শৌখিন ফল চাষি হলেও এমন একজন উদ্যোক্তা সারা দেশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমি তার ফলের বাগানে কয়েকবার গিয়েছি। বাগানে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফলের গাছ দেখে বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারিত করার জন্য উৎসাহ দিয়েছি।’
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘রেজাউলের মতো অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে মানুষরোগমুক্ত জীবনযাপন করতে করতে পারবে। আমরা এমন উদ্যমী উদ্যোক্তা খুঁজছি। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’
কেকে/এমএ