শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: রামিসা হত্যা মামলার শুনানি হাইকোর্টে রোববার      তারেকের ভারত সফর ঘিরে নতুন সমীকরণ      গ্যাস-বিদ্যুতে অচলাবস্থা      আজ শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী      অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর      ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প      তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যা বললেন রণধীর জয়সওয়াল      
খোলাকাগজ স্পেশাল
আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার নতুন দিগন্তে চট্টগ্রাম ওয়াসা
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২৫ এএম আপডেট: ১৪.০৮.২০২৬ ১১:৩২ এএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রাম নগরীর উত্তর কাট্টলী এলাকায় আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে। নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ দূষণের চাপ কমাতে উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টে দৈনিক ৫০ হাজার ঘনমিটার সক্ষমতার অত্যাধুনিক পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে গড়ে তোলা হবে বিস্তৃত বর্জ্যপানি নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (চট্টগ্রাম ওয়াসা) উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টের জন্য দুটি বড় ধরনের ডিজাইন-বিল্ড চুক্তির প্রস্তুতি শুরু করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এজেন্স ফ্রঁসেজ দ্য ডেভেলপমেন্ট (এএফডি)।

চট্টগ্রাম মহানগরীর স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে আধুনিক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তর কাট্টলী ও আশপাশের বিস্তৃত এলাকায় পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে এবং অপরিশোধিত বর্জ্য পরিবেশে নিঃসরণের ঝুঁকি কমবে।

৫০ হাজার ঘনমিটার পয়ঃশোধনাগার

চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রকাশিত ১২ আগস্ট ২০২৬-এর প্রাথমিক বাজার-সম্পৃক্ততা সভার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় দুটি প্যাকেজে কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম প্যাকেজে উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টের জন্য দৈনিক ৫০ হাজার ঘনমিটার সক্ষমতার পয়ঃশোধনাগার নির্মাণ করা হবে। এর আওতায় থাকবে নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষা এবং চালু করার কাজ।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় প্যাকেজে উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টের বর্জ্যপানি নেটওয়ার্ক ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। অর্থাৎ শুধু শোধনাগার নির্মাণ নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্যপানি সংগ্রহ করে শোধনাগারে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্কও গড়ে তোলা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু শোধনাগার নির্মাণ যথেষ্ট নয়; বর্জ্যপানি সংগ্রহ, পরিবহন, শোধন এবং নিরাপদ নিষ্কাশনের পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হয়। উত্তর কাট্টলী প্রকল্পের পরিকল্পনায় সেই সমন্বিত ব্যবস্থার প্রতিফলন রয়েছে।

উত্তর কাট্টলী কেন গুরুত্বপূর্ণ

চট্টগ্রাম দ্রুত সম্প্রসারিত একটি মহানগর। জনসংখ্যা ও আবাসিক এলাকার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পয়ঃবর্জ্য। অনেক এলাকায় এখনো আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের পরিবর্তে সেপটিক ট্যাংক, খোলা নালা কিংবা অপরিকল্পিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।

উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টে পরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা চালু হলে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সরাসরি খাল, জলাশয় বা অন্যান্য জলাধারে যাওয়ার প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন স্যানিটেশন প্রজেক্ট ফর নর্থ কাট্টলী ক্যাচমেন্ট বা সিএমএসপি-এনকেসি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে এএফডি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।

প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এএফডির অর্থায়নে বিদেশে বাস্তবায়িত চুক্তির জন্য প্রযোজ্য ২০১৯ সালের ক্রয় নির্দেশিকা অনুসরণ করে প্রাথমিক বাছাই ও দরপত্রের নথি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ঠিকাদার নির্বাচন করা গেলে প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করার সম্ভাবনাও বাড়বে।

বাজারের মতামত নিতে আগাম উদ্যোগ

প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্য ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মতামত নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এ জন্য আগামী ২০ আগস্ট একটি আর্লি মার্কেট এনগেজমেন্ট (ইএমই) সভার আয়োজন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন সদর দপ্তর ভবনের দ্বিতীয় তলার সভাকক্ষে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত সভাটি অনুষ্ঠিত হবে। চাইলে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীরা অনলাইনেও সভায় যুক্ত হতে পারবেন।

এ সভার উদ্দেশ্য শুধু প্রকল্পের তথ্য দেওয়া নয়; বরং সম্ভাব্য দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রকল্পের বিভিন্ন কারিগরি ও বাণিজ্যিক বিষয়ে মতামত, পরামর্শ, প্রশ্ন ও সুপারিশ নেওয়া। এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বাজারের সক্ষমতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

স্বচ্ছতা ও বাস্তবসম্মত দরপত্র তৈরির সুযোগ

বড় অবকাঠামো প্রকল্পে দরপত্রের শর্ত যদি বাজারের বাস্তব সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে ভালো প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণে আগ্রহ হারাতে পারে। আবার অতিরিক্ত শিথিল শর্তও প্রকল্পের মান ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই দরপত্র তৈরির আগেই সম্ভাব্য ঠিকাদারদের অভিজ্ঞতা, কারিগরি সক্ষমতা, প্রযুক্তি, নির্মাণপদ্ধতি ও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম ওয়াসার ইএমই সভা সেই সুযোগ তৈরি করছে। সম্ভাব্য দরদাতাদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য একটি মার্কেট ইনফরমেশন ফরমও প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

বদলে যেতে পারে নগর স্যানিটেশনের চিত্র

চট্টগ্রামে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। উত্তর কাট্টলী প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি নগরীর অন্যান্য ক্যাচমেন্টে একই ধরনের আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পথও তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে দৈনিক ৫০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্যপানি শোধনের সক্ষমতা একটি বড় অবকাঠামোগত সংযোজন। এর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বর্জ্যপানি নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে একটি সমন্বিত স্যানিটেশন ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হবে।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা কেবল পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে না; এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, জলাশয় সংরক্ষণ, নগর অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন

প্রকল্পের পরিকল্পনা আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবায়ন পর্যায়েই এর সাফল্য নির্ভর করবে। সময়মতো জমি, নকশা, নির্মাণ, নেটওয়ার্ক স্থাপন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শোধনাগারের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা—সবকিছু নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে নির্মাণকাজের সময় নগরবাসীর দুর্ভোগ কমানো, পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতে শোধনাগারের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।

ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা

চট্টগ্রাম ওয়াসার উত্তর কাট্টলী ক্যাচমেন্টের এ উদ্যোগ তাই শুধু একটি নতুন শোধনাগার নির্মাণের প্রকল্প নয়; এটি একটি পরিকল্পিত, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগর স্যানিটেশন ব্যবস্থার দিকে অগ্রযাত্রা।

দীর্ঘদিন ধরে অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নগরবাসী যে পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, উত্তর কাট্টলী প্রকল্প তার একটি টেকসই সমাধানের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া এবং নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এ প্রকল্প চট্টগ্রামের স্যানিটেশন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ওয়াসা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close