মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৭ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: চাপে সাধারণ মানুষ, নিরুপায় সরকার      নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান      একে একে গ্রেপ্তার ইমরান খানের তিন বোন      বাসভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়াতে চান পরিবহন মালিকরা      ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৬৫৫      ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান      হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩০৫      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ডেঙ্গুতে বাড়ছে লাশের সারি
শরীফ আহমেদ ইমন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সারা দেশে প্রকট আকার ধারণ করছে ডেঙ্গু। ক্রমশ বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল, ভারী হচ্ছে স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাস। বর্ষার দিন পেরিয়ে ডেঙ্গু এখন রূপ নিয়েছে এক ভয়ংকর জনস্বাস্থ্য সংকটে, যেখানে প্রতিটি হিসাবের পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি ভেঙে যাওয়া পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদ। হাসপাতালগুলোর বারান্দা আর আইসিইউর দরজায় এখন শুধুই বেঁচে থাকার আকুতি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এডিস মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, আর প্রতিদিনই নতুন করে হাজার হাজার রোগী ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও যখন একের পর এক তাজা প্রাণ ঝরে যায়, তখন প্রশ্ন জাগে— এই অদৃশ্য আতঙ্কের শেষ কোথায়? 

গত ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত এ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত মশাবাহিত রোগটিতে মোট প্রাণহানি ১৯০ জনে দাঁড়াল। অন্যদিকে গত একদিনে নতুন করে ১ হাজার ৬৫৫ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। 

গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, মারা যাওয়া রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ২০ দিনেই প্রাণ গেছে ৯৩ জনের, যা মাসের হিসাবে চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়ে দাঁড়াল ৬৩ হাজার ৬২৭ জনে। 

গত এক দিনে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ১৬৬ জন ও দক্ষিণ সিটি এলাকার হাসপাতালে ভর্তি হন ১৬৭ জন। এ দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি হন ২৮১ জন। 

অন্য বিভাগের মধ্যে বরিশালে ২১৭ জন, চট্টগ্রামে ৩১৪ জন, খুলনায় ২৭১ জন, ময়মনসিংহে ৪৩, রাজশাহীতে ১৪৬, রংপুরে ৪১ এবং সিলেটে নয়জন ভর্তি হন। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গেল বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজারের মতো। 

চট্টগ্রামে চলতি মাসেই ১২ জনের মৃত্যু : 

চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১১০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যা এ বছর একদিনে সর্বোচ্চ। এছাড়া চলতি মাসে ডেঙ্গুতে ১২ জন মারা গেছেন, আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪২৭ জন। যদিও জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মৃত্যু ছিল মাত্র পাঁচজন। 

চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটে কাজ করেন পলাশ দাস। কদিন আগে জ্বর ও গায়ে ব্যথা বাড়ায় ফার্মেসি থেকে একসঙ্গে তিন ডোজ ব্যথানাশক ওষুধ খান। এরপর পেট ব্যথা ও রক্তচাপ কমে জটিলতা তৈরি হলে হাসপাতালে ভর্তি হন। ডাক্তার বলেন, ‘ওষুধটা মারাত্মক হয়ে গেছে...।’ 

এরপর পলাশ দাসের মতো অনেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পেট ব্যথা, ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এক স্বজন বলেন, ‘এমনিতে ডেঙ্গুর সঙ্গে এখন বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়ায়ে পড়তেছে। উনার গায়ে ব্যথা ছিল, প্রচুর জ্বর ছিল আর মাথায় যন্ত্রণা করছিল। আর জ্বর ১০২-এর তিনের মধ্যে কন্টিনিউয়াস আছে। পরীক্ষা তো কয়েকটা করাইছে, এখন তো ভালো-মন্দের সাজেশন কিছু দিচ্ছে না।’ 

চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করছেন। এতে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। 

চিকিৎসক বলেন, ‘আমরা জানি যে ডেঙ্গুর একটা ফিচার হচ্ছে এটাতে প্লেটলেট কমে যায় অথবা প্লেটলেটের ফাংশন কমে যায়। দেখা যাচ্ছে প্লেটলেট নরমাল, কিন্তু প্লেটলেট ভালো কাজ করতেছে না— এটাও হয় যেভাবে কাজ করা দরকার। ব্যথানাশক ওষুধের একটা ইফেক্ট হচ্ছে প্লেটলেটের ওপরে। এটা প্লেটলেটকে দমায় রাখে বা সাপ্রেস করে। তখন ব্লিডিংয়ের প্রবণতাটা আরও বেড়ে যায়।’ 

এদিকে আগস্টে ১ হাজার ২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও সেপ্টেম্বরের ২০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ হাজার ৪২৭ জনে। বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যাও। আগস্টে পাঁচজনের মৃত্যু হলেও সেপ্টেম্বরের ২০ দিনেই মারা গেছেন ১২ জন। 

চট্টগ্রাম মেডিকেলের পরিচালক জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগী জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। এতে চিকিৎসাও জটিল হয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, ‘যেটা সিম্পটোমেটিক ট্রিটমেন্ট, সেটা আমরা দিই। যদি কোনো রোগী বেশি খারাপ হয়ে যায়, তখন তাদেরকে আমরা আইসিইউতে শিফট করে দিই। এই পর্যন্ত আইসিইউতে আমাদের শিফট করা লাগছে মাত্র চার থেকে পাঁচটা রোগী।’ 

এদিকে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। চসিকের প্রতিনিধি বলেন, ‘আমাদের অভিযান পরিচালনা চলছে। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন জায়গায় জরিমানা করছে, জেল দিচ্ছে। এবং এর মধ্যে ১৬টা মামলা আমরা করেছি এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ 

আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর মশক নিধন, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন বন্ধ করার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর গতি বেড়েছে : 

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, থেমে থেমে বৃষ্টি ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার অন্যতম কারণ। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, টায়ার, প্লাস্টিকের সামগ্রী ও বাসাবাড়ির আশপাশে জমে থাকায় সেখানে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। 
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুর প্রবণতা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে আবহাওয়া একটি বড় বিষয়। প্রায় প্রতিদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটছে। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, সরকার সীমিত পরিসরে মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য ডিডিটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। চাইলে সীমিত পরিসরে এটির ব্যবহার শুরু করতে পারে। মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলেও নাগরিক সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  ডেঙ্গু   লাশের সারি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close