রাজশাহীর পদ্মা সরকারি কলেজে ব্যানার ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের পাঁচজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন দুই সংগঠনের নেতারা। তবে ছাত্রশিবিরের মহানগর সভাপতি ইমরান নাজির ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ‘কুত্তার মতো পিটিয়ে রাজশাহী ছাড়া’ করার হুমকি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে শিবির নেতার হুমকির পর ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও পাল্টা প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। আর এ সংঘাতকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পুরোনো রাজনৈতিক ভূমিকার প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। শিবির নেতার এমন বক্তব্যকে অনেকেই নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের আচরণ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য— শিবির নেতার এমন লাগামহীন বক্তব্য ছাত্ররাজনীতিতে ত্রাস ছড়াচ্ছে। যা জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ছাত্ররাজনীতির জন্য শুভকর নয়। তাদের দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী কোনো দল অন্য কোনো ফ্যাসিবাদবিরোধী দলকে নিয়ে এমন মন্তব্য করতে পারে না।
এদিকে ছাত্রদলকে ‘কুত্তার মতো পিটিয়ে’ রাজশাহী ছাড়া করার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক এবি জুবায়ের। তিনি বলেছেন, এটা কোন দলের রাজনৈতিক ভাষা হতে পারে না।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘রাজশাহী শিবির নেতা যে হুমকি দিয়েছেন, ছাত্রদল অলরেডি সেটা ইতিমধ্যে শতাধিক জায়গায় বাস্তবায়ন করে ফেলেছে।’
গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। ফেসবুক স্ট্যাটাসে এবি জুবায়ের লেখেন, রাজশাহী মহানগর শিবির সভাপতির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এগুলো রাজনৈতিক ভাষা হতে পারে না। দায়িত্বশীল জায়গা থেকে মোটেই কাম্য না। সঙ্গে আরেকটা বিষয় বলতেই হয়। উনি যেটা হুমকি দিয়েছেন ছাত্রদল সেটা ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করে ফেলেছে শতাধিক জায়গায়। শিবির, বাম, সাধারণ স্টুডেন্টস কেউই বাদ যায়নি তাদের হামলার তালিকা থেকে। এগুলোরও বিচার হতে হবে।
তিনি বলেন, আর এরকম হুমকি ছাত্রদল নেতাদের বক্তব্যেও কত-শতবার এসেছে তা গুনে শেষ করা যাবে না। বেশিদূর যেতে হবে না, এই বক্তব্যের পরেই রাকিব ভাই, নাসির ভাইদের পোস্টের টোন কেমন হয়েছে সেটাই দেখেন না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল তো লিস্টও তৈয়ার করে ফেলেছিল আশপাশের মেসগুলোতে কোথায় কোথায় শিবিরের নেতাকর্মীরা থাকে।
এবি জুবায়ের আরও বলেন, সো সংযত উভয় পক্ষকেই হতে হবে। শিবির-ছাত্রদল সংঘাত এ মুহূর্তে দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। দেশের ক্রাইসিস বুঝতে হবে। দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে সবাইকেই।
এ ছাড়া ছাত্রদল রাজপথে সক্রিয় না থাকলে ছাত্রলীগ জামায়াত-শিবিরকে পিটিয়ে আবারও ‘গুপ্ত’ বানিয়ে দেবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের ভয়ে যারা একসময় গোপনে ছিল কিংবা ছাত্রলীগ হয়ে বেঁচে ছিল, তারা কীভাবে ছাত্রদলকে পিটিয়ে রাজশাহী ছাড়া করতে চায়? রাশেদ খাঁন বলেন, ‘ছাত্রদল রাজপথে না থাকলে তো ছাত্রলীগ জামায়াত-শিবিরকে পিটিয়ে আবারও গুপ্ত বানিয়ে দেবে। এই বাস্তবতা কেন এরা বুঝতে চায় না?’
তিনি আরও বলেন, দেখেন, এরা বিরোধী দল হয়েই কুত্তার মতো পিটিয়ে সরকারি দলের লোকজনকে এলাকা ছাড়া করতে চায়, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে কি করবে, তা নিশ্চয়ই অননুমেয় না?
জামায়াত-শিবিরের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী বলেন, ‘বিরোধী দল হয়েই জামায়াত-শিবির মজলুম থেকে জালিম হয়ে গেছে। সুতরাং জামায়াত জালিমের পরিণতি আওয়ামী জালিমের মতোই হবে!
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘এদেরকে কাঁচুমাচু করে দেশ পরিচালনার সুযোগ নেই।’ তার ভাষ্য, শেখ হাসিনা যেমন বলেছিলেন বিএনপিকে এক দিনও শান্তিতে দেশ চালাতে দেবেন না, জামায়াত-শিবিরও একই পথ অনুসরণ করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের লাগাম টেনে না ধরলে তারা ভবিষ্যতে আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে।’
এর আগে রাজশাহীর পদ্মা সরকারি কলেজে ভর্তি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের স্থাপন করা হেল্পডেস্কের ব্যানার টাঙানো ও ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ছাত্রশিবিরের তিনজন ও ছাত্রদলের দুজনসহ মোট পাঁচজন আহত হন। আহতদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের পর কলেজ এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নগরীর রাজপাড়া থানার মোড় এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পদ্মা আবাসিক এলাকার রাজ্জাকের মোড়ে অবস্থান করতে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কলেজে ভর্তি কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার জন্য কয়েক দিন ধরে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে একটি হেল্পডেস্ক পরিচালনা করা হচ্ছিল। মঙ্গলবার সকালে হেল্পডেস্কের ব্যানার টাঙানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে।
সকালের সংঘর্ষের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নগরের সাহেববাজার থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে সোনাদিঘীর মোড় এলাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইমরান নাজির ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, তারা ধৈর্যের সীমার একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে ছাত্রদলের প্রত্যেক নেতা-কর্মীকে ‘কুত্তার মতো পিটিয়ে’ রাজশাহী ছাড়া করা হবে।
ছাত্রশিবিরকে ‘রাজপথে জীবন দেওয়া সংগঠন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো নেতাকর্মীর ওপর হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে। ইমরান নাজির ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্যও।
শিবির সভাপতির বক্তব্যের জবাবে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব এমদাদুল হক লিমন। গত মঙ্গলবার রাতে শহীদ মিনার এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ছাত্রদলকে ‘কুকুরের মতো পিটিয়ে’ রাজশাহী থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলা শিবির সভাপতির মুখে শোভা পায় না। তিনি শিবির সভাপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, রাজশাহীর সঙ্গে ছাত্রদলের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং এ শহরের সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক ও পারিবারিক শিকড় রয়েছে। ছাত্রদল রাজপথে নামলে শিবির রাজশাহীতে পা রাখার জায়গা পাবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
পদ্মা সরকারি কলেজের ঘটনা প্রসঙ্গে এমদাদুল হক অভিযোগ করেন, শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বহিরাগতরা যোগ দিয়ে ছাত্রদলের ওপর হামলা করেছে। ছাত্রদল এর প্রতিরোধ করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কেকে/এআই