দেশে হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ সহিংস অপরাধ দিন দিন বেড়েই চলছে। সম্প্রতি বেশ কিছু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। কিছু ঘটনা ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তের বাড়ি ভাঙচুর করেছেন। অপরাধের এই বাড়বাড়ন্তকে অস্বাভাবিক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করছেন তারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে দুর্বল শাসন ব্যবস্থার কারণে মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। মানুষ মনে করছে, আইনের ফাঁক-ফোকর গলে অপরাধী পার পেয়ে যায়। সে আশঙ্কায় তারা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন। যা নতুন সংকটের সৃষ্টি করছে। আর এতে সমাজে বাড়ছে অসহিষ্ণুতা।
সম্প্রতি দুইটি ঘটনা চিন্তিত করে তুলেছে আইন বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিশ্লেষকদের। গতকাল মঙ্গলবার ময়মনসিংহে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে তার মাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
এর আগে গত শুক্র ও শনিবার পাবনায় ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিকের বাড়িতে ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোনো অপরাধ ঘটামাত্রই কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে বিচারের দৃশ্যমান ও কঠোর প্রয়োগ দেখে অপরাধপ্রবণ মানসিকতা থমকে যেতে বাধ্য হয়। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচলিত তৎপরতাই এই গভীর সামাজিক ক্ষত শতভাগ নিরাময় করতে পারবে না। অপরাধ দূরীকরণে সরকার, সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগই অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা আরও বলছেন, একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও গণমাধ্যমের যৌথ উদ্যোগে সমাজের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা ও পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা জোরদার করা আবশ্যক।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘দেশে খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাইসহ অপরাধ বেড়ে যাওয়ার মূল কারণগুলোর মধ্যে হলো সামাজিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য, শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের ব্যাপক অভাব। যখন সমাজে মানুষের কোনো নিরাপত্তা থাকে না, তখন তারা অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। তবে আইনের সঠিক প্রয়োগ করে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
এ ধরনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডিফেন্ডার পাবনা জেলা শাখার সদস্য সচিব আব্দুর রব মন্টু বলেন, ‘আইন, বিচার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার জায়গা থেকেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। তবে এটি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে হবে। কারণ, প্রতিবাদের নামে আইন হাতে তুলে নেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতিশোধ: ময়মনসিংহে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে তার মাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার প্রধান আসামির বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। গতকাল সকালে গফরগাঁওয়ে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে ওই নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরদিন শুক্রবার রাতে ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে গফরগাঁও থানায় মামলা করেন।
পুলিশ জানায়, মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন গফরগাঁওয়ের শরীফ (২৩), তার ভাই আরিফ (২১), ফাহিম (২২), রাজীব (২৩) ও এনামুল (২২)। ঘটনার রাতেই অভিযান চালিয়ে রাজীবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকি আসামিরা পলাতক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গতকাল সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মামলার প্রধান আসামি শরীফের বাড়িতে যান। এ সময় তারা বসতঘরের টিনের বেড়া ও চাল ভাঙচুর করেন। পরে টিনগুলো খুলে বাড়ির পাশে স্তূপ করে রাখা হয়।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গফরগাঁওয়ের ওই ভুক্তভোগী নারীর স্বামী প্রবাসী। গত বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে পানি ও কুড়াল চাওয়ার অজুহাতে পাঁচজন ওই বাড়ির দরজার কাছে যান। প্রবাসীর ছেলে পানি নিয়ে দরজার কাছে এলে তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। ঘরে ঢুকে ওই নারীকে ধর্ষণ করা হয়। এ ছাড়া ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ভুক্তভোগীর কাছে টাকাও দাবি করা হয়।
গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান সেখ বলেন, প্রধান আসামির বাড়ি ভাঙচুরের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে অন্য আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশকে তথ্য দিতে এলাকাবাসীর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।
ভেঙে দেওয়া হলো প্রধান আসামির তিনতলা বাড়ি : পাবনায় ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিকের তিনতলা বাড়িতে গত শুক্র ও শনিবার ভাঙচুর করেছে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’। বাড়ির দরজা-জানালা, ঘরের আসবাব লুট হয়ে গেছে। বাড়িটি অনেকটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে উপজেলার কুলুনিয়া এলাকায় হাজারো মানুষ ও পুলিশের সামনেই বাড়ি ও দোকান ভাঙা শুরু হয়। ভবনটির ছাদ ভেঙে রডও লুট করা হয়। এ ঘটনায় কেউ মামলা বা অভিযোগ করেনি বলে জানান পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম।
ওসি বলেন, ‘এত বড় মবকে নিবৃত্ত করতে গেলে পুলিশের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতো। সে জন্য আমরা ঠেকানোর বৃথা চেষ্টা করিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ বাধা দিলে বিক্ষুব্ধরা বলত, পুলিশ ধর্ষকদের পক্ষ নিয়েছে; তাই আমরা অনেক ভেবেচিন্তে কাজ করছি।’
এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি জিল্লুর রহমান বলেন, ‘মোস্তফা নৃশংস কাজ করেছে। এ জন্য আমরা আইনগতভাবে তার ফাঁসি চাই। কিন্তু যারা মোস্তফার বাড়িঘর গুঁড়িয়ে লুটপাট করল, ভয়ংকর তাণ্ডব চালাল, তারা আরও জঘন্য কাজ করল।’
ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশুটির বাবা বলেন, ‘আমার মেয়ে সাত দিন নিখোঁজ থাকলেও পুলিশ কোনো ভূমিকা নেয়নি। লাশ উদ্ধারের পর মানুষের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের ভূমিকায় মানুষ ভীষণ ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভ থেকে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।’
কেকে/ এমএস