দেশে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিম্নমুখী হলেও তা এখনো সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সীমার ওপরে রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা, দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত এবং সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রভাবও মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি)।
এ অবস্থায় অর্থনীতিতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অভিঘাতের প্রভাব আরও পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ও ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) ভিত্তিক মূল্যস্ফীতির ওপর এসব অভিঘাতের প্রভাব পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে আপাতত নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশেই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪তম মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) সভায় এসব পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় সাম্প্রতিক দেশীয় ও বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এতে বলা হয়, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির প্রবণতা নিম্নমুখী রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সীমার মধ্যে আসেনি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ সীমা ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।
এমপিসির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা থাকলেও অর্থনীতিতে নতুন কিছু ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখনো অস্থিতিশীল। দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাজারের ওপরও পড়তে পারে।
এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ব্যয় বেড়েছে। এর মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব কতটা পড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে এমপিসি।
একই সময়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টিও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে একদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ার মাধ্যমে পণ্য ও সেবার দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন বেতন কাঠামোর সম্মিলিত প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এমপিসি মনে করছে, এ মুহূর্তে নীতি সুদহারে পরিবর্তন আনার আগে সাম্প্রতিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অভিঘাতগুলোর প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এসব অভিঘাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ভোক্তা মূল্যসূচকভিত্তিক মূল্যস্ফীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
মুদ্রানীতি নির্ধারণে নীতি সুদহার গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাধারণত সুদহার বাড়িয়ে অর্থের প্রবাহ ও চাহিদা কমানোর চেষ্টা করা হয়। আবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার প্রয়োজন হলে সুদহার কমানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই নীতি নির্ধারকদের অন্যতম বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
সভায় বর্তমান নীতি সুদহারে কোনো পরিবর্তন না আনার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মূলত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতা কতটা স্থায়ী হয় এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নতুন বেতন কাঠামোর কারণে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ কতটা তৈরি হয়, তা দেখে পরবর্তী সময়ে মুদ্রানীতির অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের এক এমপিসি পর্যবেক্ষণেও বলেছিল, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে রাজস্ব আয় যথেষ্ট না বাড়লে সরকারকে ঘাটতি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এতে অর্থবাজারে চাপ তৈরি হয়ে আর্থিক ব্যবস্থায় সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
জুলাইয়ের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘসময় পর নীতি সুদহার কমানোর পথ শুরু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতির চাপ সামলে অর্থনীতিতে ঋণ ও বিনিয়োগের গতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। তবে এক দফা কমানোর পরই আবার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ দিনের রেপো কার্যক্রমেও ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ হার দেখা যাচ্ছে। ২২ সেপ্টেম্বরের রেপো নিলামে ১৪৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ৯ হাজার ২৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয় এবং একই পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা হয়।
অন্যদিকে ২৩ সেপ্টেম্বরের ৯১ দিনের বাংলাদেশ কম্পাউন্ডেড রেট ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ। একই দিনে আন্তঃব্যাংক বাজারে রাতারাতি অর্থের গড় হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও অর্থবাজারে সুদের হার, তারল্য ও ঋণের চাহিদার ওপর এর প্রভাব থাকবে।
নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখার ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের মূল ব্যয়ও আপাতত একই থাকছে। ফলে ব্যাংকঋণের সুদহারে বড় ধরনের নিম্নমুখী পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত থাকবে।
এতে ব্যবসা ও শিল্প খাতের নতুন ঋণ নেওয়ার ব্যয় কমার গতি ধীর হতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সুদের হার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে বহাল থাকবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঋণের সুদহার ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে নামানো প্রয়োজন। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশে নেমে যাওয়া উদ্বেগজনক। উচ্চ নীতি সুদহার বহাল থাকলে ঋণের ব্যয় কমার সুযোগ সীমিত থাকে এবং বাজেটে দেওয়া বিনিয়োগ-প্রণোদনার সুফলও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে তাসকীন আহমেদ বলেন, শুধু সুদহার কমিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না। উদ্যোক্তারা তখনই নতুন বিনিয়োগ করবেন, যখন বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা, স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং বিনিয়োগ থেকে গ্রহণযোগ্য মুনাফার সম্ভাবনা থাকবে।
সভায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারপারসন ফেরদৌসী নাহার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ।
কেকে/এআই