রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডসংলগ্ন ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ চত্বর’ দখল করে প্রতিদিন ভোর থেকে বসছে অবৈধ বাজার। স্থানীয়দের ভাষায় এটি ‘সকালের বাজার’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, বাজারটি ঘিরে নিয়মিত চাঁদাবাজি চলছে এবং বাজারের কারণে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এছাড়া চত্বর থেকে শহীদের নামফলকও চুরি হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজসংলগ্ন এই চত্বরে প্রতিদিন সকাল হলেই প্রায় ৫০০টি দোকান বসে। অথচ অল্প দূরেই টাউন হল কাঁচাবাজার থাকলেও ফুটপাত ও চলাচলের রাস্তা দখল করে এই বাজার পরিচালিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডে ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ চত্বর’ উদ্বোধন করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এর আগে স্থানটি ‘নানক চত্বর’ নামে পরিচিত ছিল। পরে জুলাই আন্দোলনের শহীদ ফারহান ফাইয়াজের স্মরণে চত্বরটির নতুন নামকরণ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহীদের নামফলকটি নেই। কে বা কারা এটি খুলে নিয়ে গেছে, সে বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। চত্বরটির ঠিক বিপরীত পাশেই রয়েছে তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়। পাশাপাশি স্যার সৈয়দ রোড, ইকবাল রোড ও আওরঙ্গজেব রোড—এই তিন সড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে সকালবেলা হাঁটতে আসেন। কিন্তু বাজারের কারণে হাঁটার পথ পুরোপুরি দখল হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র চার থেকে পাঁচ মাস আগে একজন জুলাই শহীদের নামে চত্বরটির উদ্বোধন করা হলেও এখন সেখানে অবৈধ বাজার বসে পুরো এলাকার সৌন্দর্য নষ্ট করছে। বাজারের আবর্জনা ও দুর্গন্ধে পরিবেশও দূষিত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, স্থানটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকলেও ওয়ার্ড সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাহিদ ফেরদৌস। সিটি করপোরেশন যে এসএস গ্রিল ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করেছিল, বাজারের দোকানদারদের কারণে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পরিচ্ছন্নতার নামে প্রতিদিন বাজারের দোকানিদের কাছ থেকে টাকা তোলা হয়। স্থানীয়দের দাবি, একটি চক্র এই অর্থ সংগ্রহ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের মধ্যে বৈঠি রুবেল, ইরফান ওরফে ডাম্মাক ইরফান, জিয়া ওরফে কানা জিয়া, রুবি এবং এরশাদ ওরফে সোনারু এরশাদের নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৈঠি রুবেল বর্তমানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এছাড়া ডাম্মাক ইরফান, কানা জিয়া ও সোনারু এরশাদ এই বাজার পরিচালনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সোনারু এরশাদ একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মোহাম্মদপুর ২৯ নম্বর ওয়ার্ড প্রচার লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, তারা সবাই জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা। ক্যাম্পের এক বাসিন্দা জানান, এই বাজারটি এখানে দীর্ঘদিন যাবৎ বসছে। এর আগে আওয়ামী লীগের সময় এখানে বাজার ছিল, এখন বিএনপির সময়ও বাজার রয়েছে। একেক সময় একেকজন নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এখানে বাজার না থাকাটাই ভালো। এই স্থানে সকালবেলা মানুষ হাঁটাহাঁটি করেন। বাজারের কারণে এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তারা রিসিভ করেননি। কারও মোবাইল নম্বর আবার বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, “রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের পাশে আওরঙ্গজেব রোডসংলগ্ন যে বাজারটি বসে, সেটি আমাদের নজরে এসেছে। খুব দ্রুত বাজারটি উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “এটি সিটি করপোরেশনের জায়গা। এখানে জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া এক ছাত্রের নামে ‘ফারহান ফাইয়াজ চত্বর’ নামকরণ করা হয়েছে। এখানে একটি বাজার বসে। সিটি করপোরেশন যদি বাজারটি উচ্ছেদের অভিযান পরিচালনা করে, তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।”
কেকে/এলএ