কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত চরটেকী গ্রামের সরু কাঁচা পথ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই একের পর এক বাইসাইকেল ছুটে চলে সেই পথ ধরে। টুংটাং ঘণ্টার শব্দে ভেঙে যায় সকালের নীরবতা। সাদা স্কুলড্রেস পরা কিশোরীরা কেউ দ্রুত প্যাডেল চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার সহপাঠীদের সঙ্গে গল্প করতে করতে বিদ্যালয়ের দিকে রওনা দিচ্ছে। কারও কাঁধে বইভর্তি ব্যাগ, কারও সাইকেলের ঝুড়িতে খাতা-কলম। গ্রামের মেঠোপথ যেন প্রতিদিনই রূপ নেয় স্বপ্নের পথে।
দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে যে কেউ মনে করতে পারেন, বুঝি কোনো সাইকেল র্যালি চলছে। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায়, এটি চরটেকী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের মাঠ সারি সারি সাইকেলে ভরে যায়। প্রতিটি সাইকেল যেন একটি পরিবারের স্বপ্ন, একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস এবং দীর্ঘ সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক। এ কারণেই প্রায় দেড় দশক ধরে স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রতিষ্ঠানটির নাম হয়ে গেছে 'সাইকেল বালিকা স্কুল'।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে চার শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের মধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক নিয়মিত সাইকেলে করে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। তবে এই সাফল্যের পেছনে শুধু ভালো ফল নয়, রয়েছে তিন দশকের সামাজিক পরিবর্তন, মানসিকতার বিবর্তন এবং মেয়েদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অনন্য ইতিহাস।
সাইকেলই হয়ে উঠেছে শিক্ষার সেতুবন্ধ
সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন তিন থেকে আট কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। চরাঞ্চলে নিয়মিত গণপরিবহন না থাকায় সাইকেলই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যাতায়াতের মাধ্যম।
সকাল দশটার আগেই বিদ্যালয়ের সামনে জমে ওঠে ব্যস্ততা। দলবেঁধে এসে নির্ধারিত স্থানে সাইকেল রেখে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। ছুটি শেষে আবার একসঙ্গে বাড়ির পথে রওনা দেয়। এতে যেমন সময় সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি নিরাপদ যাতায়াতও নিশ্চিত হচ্ছে। গ্রামের মানুষের কাছে মেয়েদের সাইকেলে বিদ্যালয়ে যাওয়া এখন আর বিস্ময়ের কিছু নয়; বরং এটি দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক দৃশ্য।
যে সমাজ একসময় আপত্তি তুলেছিল
একসময় গ্রামের রাস্তায় কোনো মেয়েকে সাইকেল চালাতে দেখলেই নানা ধরনের কটূক্তি শুনতে হতো। অনেকের ধারণা ছিল, মেয়েদের সাইকেল চালানো সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের নানা মন্তব্যের কারণে অনেক অভিভাবক মেয়ের জন্য সাইকেল কিনে দিতে সাহস পেতেন না।
ফলে দূরের পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হতো। বর্ষাকালে কাদা, জলাবদ্ধতা ও ভাঙাচোরা সড়কের কারণে যাতায়াত আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠত। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করতে না পেরে মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিত। অনেক পরিবারের কাছে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা তখন ছিল স্বপ্নের মতো।
একজনের সাহস বদলে দিল শত শত জীবনের গল্প
পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই। জয়বিষ্ণ গ্রামের কেরামত আলীর মেয়ে সামিয়া ফেরদৌসী কলি ১৯৯৩ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নিয়মিত সাইকেলে বিদ্যালয়ে যাতায়াত শুরু করেন। তিনিই ছিলেন প্রতিষ্ঠানের প্রথম সাইকেল আরোহী ছাত্রী।
প্রতিদিন কটূক্তি, বিদ্রূপ আর সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তার সেই সাহসই পরবর্তীতে অন্য মেয়েদের অনুপ্রাণিত করে। একজন থেকে দুজন, দুজন থেকে কয়েকজন—এভাবেই বাড়তে থাকে সাইকেল চালানো শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে সামিয়া একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিন দশক আগে তার নেওয়া সাহসী সিদ্ধান্ত আজ পুরো এলাকার সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিভাবকদের মানসিকতারও বদল
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিও।
শিক্ষার্থী মাহিয়ার বাবা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আগে মেয়েকে একা এত দূর পাঠাতে ভয় লাগত। আবার প্রতিদিন পৌঁছে দেওয়া বা নিয়ে আসাও সম্ভব হতো না। সাইকেল কেনার পর সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে গেছে। এখন ও সময়মতো স্কুলে যায়, সময়মতো বাড়ি ফেরে। সবচেয়ে বড় কথা, ওর আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে।’
সামি আক্তারের মা রেহেনা বেগম বলেন, ‘প্রথমদিকে অনেকে নানা কথা বলত। বলত, মেয়েকে সাইকেল চালাতে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু মেয়ের লেখাপড়ার কথা ভেবে আমরা সেসব কথায় কান দিইনি। এখন যারা তখন সমালোচনা করত, তারাই নিজেদের মেয়ের জন্য সাইকেল কিনে দিচ্ছে।’
আরেক অভিভাবক আবুল কালাম বলেন, ‘আমাদের সময়ে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ কম ছিল। এখন বুঝতে পারছি, একটি সাইকেল শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি মেয়ের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। সাইকেল থাকায় ও নিয়মিত ক্লাস করতে পারে, কোচিংয়েও যেতে পারে।’
শিক্ষার্থী সিনথিয়া নাজনীনের মা বলেন, ‘মেয়ে আগে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরত। এখন সাইকেলে আসা-যাওয়া করে সময়ও বাঁচছে, পড়াশোনার জন্য বাড়তি সময় পাচ্ছে।’
সময় বাঁচছে, বাড়ছে আত্মবিশ্বাস
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিয়া জানায়, তাদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। আগে হেঁটে আসতে অনেক সময় লাগত। এখন সাইকেলে নির্ধারিত সময়েই পৌঁছানো যায়। তবে বর্ষাকালে কাদাময় সড়কে চলাচল এখনও কষ্টকর। দ্রুত সড়ক সংস্কার হলে দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী সামি আক্তার বলেন, ‘শুরুতে কিছু মানুষের মন্তব্য শুনতে হলেও এখন আর সেগুলোকে গুরুত্ব দিই না। আমাদের লক্ষ্য ভালোভাবে লেখাপড়া করে নিজের পরিচয় তৈরি করা। সাইকেল সেই পথ অনেক সহজ করে দিয়েছে।’
শিক্ষার্থী আফরিন জানায়, শিক্ষা সফরে গিয়ে তারা যখন নিজেদের বিদ্যালয়ের পরিচয় দেয়, তখন ‘সাইকেল বালিকা স্কুল’ নাম শুনেই ব্যারিস্টার সুমন প্রতিষ্ঠানটিকে চিনে ফেলেছিলেন। ঘটনাটি তাদের জন্য গর্বের।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনথিয়া নাজনীন মুমু বলে, ‘ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই সাইকেল চালাচ্ছি। প্রথমে ভয় লাগত। এখন বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেলে স্কুলে আসতে খুব ভালো লাগে। নিজের কাজ নিজে করার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।’
শিক্ষকদের চোখে বদলে যাওয়া এক জনপদ
বাংলা বিভাগের সহকারী শিক্ষক আমিনুল হক বলেন, শুরুতে দূরের কয়েকজন ছাত্রীর পরিবারকে সাইকেল কিনে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পরে অন্যরাও উৎসাহিত হন। বর্তমানে এটি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।
সহকারী শিক্ষিকা সাজিদা আক্তার বলেন, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, শিক্ষার্থীদের পরিশ্রম এবং ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের কারণে বিদ্যালয়ের সুনাম অনেক বেড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাশাপাশি দূরবর্তী এলাকা থেকেও অভিভাবকেরা তাঁদের মেয়েদের এখানে ভর্তি করাচ্ছেন। নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ায় শিক্ষার মানও উন্নত হয়েছে।
সাফল্যের মাঝেও রয়েছে অবকাঠামোগত সংকট
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়টি শিক্ষার মান ধরে রেখেছে। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়ক, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব এবং অসম্পূর্ণ অবকাঠামোর কারণে শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইলিয়াস উদ্দিন চুন্নু বলেন, বর্ষাকালে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি সাইকেল বিদ্যালয় থেকে অনেক দূরে রেখে শিক্ষার্থীদের হেঁটে আসতে হয়। তাই দ্রুত সড়ক পাকাকরণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নতুন একাডেমিক ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, নিরাপদ সাইকেল শেড, প্রধান ফটক নির্মাণ এবং মাঠ ভরাটের কাজ বাস্তবায়ন জরুরি।
প্রশাসনের আশ্বাস
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রূপম দাস বলেন, চরটেকী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ জেলার অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানকার অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বদলে গেছে শুধু যাতায়াত নয়, বদলে গেছে সমাজও
চরটেকীর মানুষ মনে করেন, এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু ভালো ফলাফল নয়; বরং একটি রক্ষণশীল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
যে সমাজ একসময় মেয়েদের সাইকেল চালানোকে ভালো চোখে দেখত না, আজ সেই সমাজই তাদের উৎসাহ দেয়। গ্রামের ছোট ছোট মেয়েরা বড় আপুদের সাইকেলে যেতে দেখে নিজেরাও একদিন সেই স্বপ্ন দেখে। অভিভাবকেরা বুঝতে শিখেছেন, একটি সাইকেল শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি মেয়ের শিক্ষাজীবন, আত্মনির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্ন পূরণের সঙ্গী।
প্রতিদিন চরটেকীর পথে ছুটে চলা শত শত সাইকেল তাই শুধু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেয় না; এগুলো বহন করে একটি সমাজের বদলে যাওয়ার গল্প। প্রমাণ করে, সুযোগ, সাহস এবং পরিবারের সমর্থন পেলে মেয়েরাও অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর সাহসী পদক্ষেপ কীভাবে একটি জনপদের মানসিকতা বদলে দিতে পারে, চরটেকীর 'সাইকেল বালিকা স্কুল' তারই এক উজ্জ্বল, অনুকরণীয় এবং অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
কেকে/ এমএস