নারী চাইলে কী না পারে! ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে নারীকে আটকে রাখার দিন আজ অতীত। প্লেনের ককপিট থেকে বাসের স্টিয়ারিং, অফিসের সিইওর চেয়ার থেকে বোর্ডরুমের চেয়ারম্যানের আসন—সবখানেই আজ নারীর সরব উপস্থিতি। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়েও নারীর সাহসিকতার সাক্ষ্য মেলে হরহামেশা। এমনই এক বিশ্বভ্রমণকারী নারীর নাম নাজমুন নাহার। লাল-সবুজ পতাকা কাঁধে নিয়ে যিনি পাড়ি দিয়েছেন পৃথিবীর প্রায় গোটা মানচিত্র।
গত ৭ আগস্ট ২০২৬ হিমালয়কন্যা ভুটান সফরের মধ্য দিয়ে নাজমুন নাহার স্পর্শ করেছেন তাঁর জীবনের ১৮৫তম দেশ ভ্রমণের মাইলফলক। এই অভিযানের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৮৫তম দেশ ভ্রমণের এই অ্যাডভেঞ্চারে ভুটানের পাহাড়ি নৈসর্গিক দৃশ্য তাঁকে নতুন করে বিস্মিত করেছে। ভুটান তাঁর জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ভ্রমণগুলোর একটি। পারো, থিম্পু, পুনাখা, ডোচুলা, বুমথাং, ফোবজিখা ও হা ভ্যালি—প্রতিটি জায়গা ঘুরে সেখানে উড়িয়েছেন লাল-সবুজের পতাকা। অপূর্ব পাহাড়, হিমালয়ের পর্বতশ্রেণি, সবুজ উপত্যকা আর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এক নান্দনিক দেশ ভুটান।
নাজমুন নাহারই প্রথম বাংলাদেশি নারী এবং বিশ্বের প্রথম মুসলিম নারী, যিনি ১৮৫টি দেশ ভ্রমণ করে গড়েছেন এক অনন্য ইতিহাস। আজ থেকে ঠিক ২৬ বছর আগে, ২০০০ সালে ভারত ভ্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তার এই দীর্ঘ যাত্রা। এই ছাব্বিশ বছরের অভিযাত্রায় নাজমুন নাহার পৃথিবীর ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে উড়িয়েছেন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। এই যাত্রা থেমে থাকেনি এক জায়গায়—২০১৯ সালে ১৩৫তম দেশ, ২০২১ সালের অক্টোবরে সাওটোমে অ্যান্ড প্রিন্সিপ ভ্রমণের মাধ্যমে ১৫০তম দেশ, ২০২৩ সালে তাজিকিস্তান ভ্রমণে ১৫৫তম দেশ, ২০২৪ সালে ভানুয়াতু ভ্রমণে ১৭৫তম দেশ, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাহামা ভ্রমণে ১৮৪তম দেশ—একের পর এক মাইলফলক ছুঁয়ে অবশেষে ভুটানে এসে দাঁড়িয়েছে তার সংখ্যাটা ১৮৫।
নাজমুন নাহারের জন্ম বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলার লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার গঙ্গাপুর গ্রামে, ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি পাড়ি জমান সুইডেনে। সেখানকার লুন্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ‘এশিয়ান স্টাডিজ’ বিষয়ে অর্জন করেন উচ্চতর ডিগ্রি। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি ডিগ্রি নেন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এশিয়া’ বিষয়ে।
নাজমুন নাহারের ভ্রমণের নেশার পেছনে রয়েছে তার দাদা ও বাবার অনুপ্রেরণা। তার দাদা একজন ইসলামি স্কলার ছিলেন, যিনি ১৯২৬ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। দাদার সেই ভ্রমণ-কাহিনি শৈশব থেকেই ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে তাঁকে। বাবাও ছোটবেলায় তাকে শোনাতেন ভ্রমণের গল্প, আর সেই গল্পগুলো গেঁথে যায় ছোট্ট নাজমুনের মনে।
তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় পৃথিবীর ম্যাপ পুরোপুরি মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। ম্যাপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা, কোন দেশের পাশে কোন দেশ, কয়টা দেশ আছে—এসব আমার মধ্যে অনুপ্রেরণার সৃষ্টি করেছে।’ বাবা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাবা আমাকে শিখিয়েছেন, চার দেয়ালের মাঝে যেন আবদ্ধ না থাকি। কারণ জীবনটা খুব অল্প সময়ের জন্য। এই অল্প সময়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। যত বাধাই আসুক না কেন, সবকিছু পেছনে ফেলে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। কোনো বাধাই আমাকে থামাতে পারেনি।’
ভ্রমণ একটি ব্যয়বহুল কাজ। এই ব্যয় মেটাতে কখনো স্পনসর পেয়েছেন, কখনো বা নিজের কষ্টার্জিত অর্থেই মিটিয়েছেন সব খরচ। ২০০৬ সালে স্কলারশিপ নিয়ে যখন সুইডেনে পড়তে যান, তখন পড়াশোনার পাশাপাশি করেছেন পার্টটাইম কাজ। সেই কাজের আয় থেকে জমানো টাকা দিয়েই চালিয়েছেন ভ্রমণ। বেশিরভাগ মানুষ যখন পড়াশোনা শেষে চাকরি করে গাড়ি-বাড়ি গড়ার স্বপ্ন দেখেন, নাজমুন তখন উপার্জনের টাকা খরচ করেছেন ভ্রমণে—এটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ভ্রমণ করতে করতেই তিনি বের করে ফেলেছেন কম খরচে ভ্রমণের নানা কৌশল। পৃথিবীর বিভিন্ন পথ, মানচিত্র, শহর ও দেশ নিয়ে করেছেন প্রচুর পড়াশোনা, থেকেছেন নানা দেশের সাশ্রয়ী ইয়ুথ হোস্টেলে।
ভ্রমণ নাজমুনকে মুখোমুখি করেছে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়েছেন বারবার, তবু পিছিয়ে আসার মানুষ তিনি নন। তাঁর প্রথম বিদেশ ভ্রমণ ছিল ভারতে। সেই ভ্রমণে ঝরনার পানিতে গোসল করা, তাঁবুতে রাত কাটানো, পিঠে ব্যাগ নিয়ে ২০ কিলোমিটার হাঁটা, ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, ব্যায়াম করা, সবার সঙ্গে মিলে রান্না করে খাওয়া ও নিজের জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা—এসব আজও তাঁর স্মৃতিতে অমলিন। এই ভ্রমণই তাঁকে শিখিয়েছিল বিশ্বভ্রমণের প্রথম পাঠ।
দেড় শতাধিক দেশ ভ্রমণে দেড় শতাধিক রকমের মানুষ, খাবার, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন তিনি। আফ্রিকায় পড়েছেন মরুঝড়ের মুখে, মধ্যরাতে আটকা পড়েছেন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে, সাহারা মরুভূমিতে ঝড়ের কবলে পড়ে হয়েছেন রক্তাক্ত। কখনো আদিবাসীদের সঙ্গে ঘুমিয়েছেন মাটির ঘরে, কখনো রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার হতে না পেরে আশ্রয় নিয়েছেন অচেনা কোনো পরিবারের ঘরে।
নাজমুন বলেন, ‘পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এমনও হয়েছে, অচেনা শহরে রাস্তা চিনি না, পিঠে ব্যাগ নিয়ে হাঁটছি। সবসময় মোবাইলে ইন্টারনেট থাকে না, তখন স্থানীয় মানুষের সাহায্য নিতে হয়। অনেক জটিলতার মধ্যে পড়তে হয়েছে, কখনো না খেয়েও থাকতে হয়েছে। তবে প্রায় সব জায়গাতেই মানুষের কাছ থেকে যথেষ্ট সাহায্য পেয়েছি। মানুষ যখন পিঠে ট্রাভেল ব্যাগ দেখে, তখন আক্রমণাত্মক আচরণ করে না।’
নাজমুন শুধু ভ্রমণই করেননি, বাংলাদেশের পতাকার সঙ্গে বহন করেছেন বিশ্বশান্তির বার্তাও। ‘নো ওয়ার, ওনলি পিস’, ‘সেভ দ্য প্ল্যানেট’, ‘স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ’, ‘উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট’—ভ্রমণের প্রতিটি ধাপে এই বার্তাগুলো ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি পৃথিবীর নানা প্রান্তে।
তাঁর ভাষায়, ‘পুরো পৃথিবী একটা হুমকির মধ্যে আছে। যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। বাল্যবিবাহ রোধ করা ও পৃথিবীর পরিবেশ বাঁচানোর জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বর্জন করতে হবে প্লাস্টিক। প্রতিটি দেশে গিয়ে আমি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাই। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি এসব সচেতনতামূলক বার্তা সবার মাঝে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি।’
দেশ ভ্রমণে অনন্য কৃতিত্বের জন্য অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন নাজমুন নাহার। পেয়েছেন ‘পিস রানার’ সম্মাননা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘আন্তর্জাতিক পিস টর্চ বিয়ারার অ্যাওয়ার্ড’, ‘ডটার অব দ্য আর্থ’ উপাধি, দক্ষিণ সুদানে ‘উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৮ সালে জাম্বিয়ার গভর্নর হ্যারিয়েট কায়োনার হাত থেকে পেয়েছেন ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি, আর ২০২৩ সালে সেন্ট লুসিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ জে. পিয়ের তাঁকে সম্মানিত করেছেন ‘ব্রেভ গার্ল’ উপাধিতে।
এ ছাড়া মিস আর্থ কুইন অ্যাওয়ার্ড, অনন্যা শীর্ষ দশ সম্মাননা, গেম চেঞ্জার অব বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড, মোস্ট ইনফ্লুয়েন্সিয়াল উইমেন অব বাংলাদেশ, গ্লোব অ্যাওয়ার্ড, অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল সম্মাননা, জনতা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, তিন বাংলা সম্মাননা, রেড ক্রিসেন্ট মোটিভেশনাল অ্যাওয়ার্ড, সফল নারী সম্মাননা ও লক্ষ্মী তারুণ্য সম্মাননাসহ দেশে-বিদেশে মোট প্রায় ৫০টি সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাঁর ব্যতিক্রমী অর্জন ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁকে জানিয়েছেন সম্মাননা ও অভিনন্দন।
কেকে/এমএস