ফেনীর পাঁচ উপজেলার সাতটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় না হওয়ায় অব্যয়িত ৭ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন। ১২ কোটি ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭৮ টাকার প্রকল্পে জেলা প্রশাসনের তদারকি, ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করায় মাত্র ৪ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ১৩৫ টাকা ব্যয় হয়েছে।
ফেনী জেলার ছয়টি উপজেলা থেকে মোট ১২টি খাল পুনঃখননের প্রস্তাব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সরকারের বিশেষ বরাদ্দে জেলার পাঁচটি উপজেলার সাতটি খাল পুনঃখননের জন্য মোট ১২ কোটি ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৯ কিলোমিটার।
গত ৩১ মে ফুলগাজী উপজেলার গতিয়া খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মুন্সী রফিকুল আলম মজনু। ২ জুন ফেনী সদর উপজেলার মোহাম্মদ আলী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন ফেনী-২ আসনের এমপি জয়নাল আবেদীন। ৮ জুন জেলার অন্যান্য উপজেলার খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক।
ফেনী সদর, দাগনভূঞা, ফুলগাজী, পরশুরাম ও সোনাগাজী—এই পাঁচ উপজেলার সাতটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত ৪০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে এই বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর অব্যয়িত ৭ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ টাকা ব্যাংক চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ফেনীর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাহবুব আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে খাল পুনঃখনন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নিবিড় তদারকি, সরকারি নির্দেশনার অনুসরণ, ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর অব্যয়িত অর্থ সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যাংক চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যনুযায়ী, ফেনী জেলার বিভিন্ন উপজেলার খাল পুনঃখনন প্রকল্পের জন্য সরকার মোট ১২ কোটি ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭৮ টাকা বরাদ্দ দেয়। জেলা প্রশাসক মনিরা হকের নিয়মিত তদারকি ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন করতে মোট ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ১৩৫ টাকা। ফলে মূল বরাদ্দ থেকে ৭ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ টাকা অব্যয়িত থাকে, যা সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যাংক চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়।
মো. মাহবুব আলমের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সোনাগাজী উপজেলার ডাংগি খাল (নুর আলমের বাড়ির উত্তর পাশ থেকে ফেনী নদী পর্যন্ত) পুনঃখননের জন্য সরকার ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৫ টাকা বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পের আওতায় সরকারি মান বজায় রেখে ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে ব্যয় হয়েছে ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৬২১ টাকা। কাজ শেষে অব্যয়িত ৪ কোটি ৯০ লাখ ২০ হাজার ৩২৪ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ফুলগাজী উপজেলার গতিয়া খাল, তারালিয়া ও নোয়াপুর (গতিয়া খাল থেকে সিলোনিয়া খাল পর্যন্ত) ২ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য সরকার ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ১২ হাজার ৭৫৪ টাকা এবং অব্যয়িত ১৬ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ভেদা খাল (দক্ষিণ টেটেশ্বর থেকে কহুয়া নদী পর্যন্ত) ২ দশমিক ৬ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য সরকারের বরাদ্দ ছিল ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৩১ লাখ ১৯ হাজার ৭৮২ টাকা এবং অব্যয়িত ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৬০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ফেনী সদর উপজেলার দাউদপুর-মধুয়াই খাল (মধুয়াই ব্রিজ থেকে মধুয়াই হয়ে ছোট ফেনী নদী পর্যন্ত) ৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য সরকার ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৫ টাকা বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ ২৮ হাজার ১৬৫ টাকা এবং অব্যয়িত ১ কোটি ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬১০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
একই উপজেলার মোহাম্মদ আলী খাল (মোহাম্মদ আলী বাজার থেকে এলাহীগঞ্জ পর্যন্ত) ৫ দশমিক ৭২৫ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৩১ টাকা। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৮৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭০ টাকা এবং অব্যয়িত ৬১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬১ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের জয়নারায়ণপুর থেকে বিরলী খাল ১ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য সরকার ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪৭৪ টাকা এবং অব্যয়িত ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫২১ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া জয়লস্কর ইউনিয়নের সিলোনিয়া বাজার থেকে নোয়াজপুর খাল পর্যন্ত ২ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য সরকার ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেয়। খনন কাজে ব্যয় হয়েছে ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৮৬৯ টাকা এবং প্রকল্পের কাজ শেষে অব্যয়িত ২৫ লাখ ৬২ হাজার ১২৬ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অতীতের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত বরাদ্দের দাবি ও সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এবার ফেনীতে খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
তাদের দাবি, জেলা প্রশাসক মনিরা হকের নিয়মিত মাঠপর্যায়ের তদারকি ও কঠোর মনিটরিংয়ের ফলে প্রতিটি খালের পুনঃখনন কাজ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। এতে একদিকে কৃষি সেচব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে খালগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে সরকারি অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত হওয়ায় অব্যয়িত বিপুল পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারজানা হোসাইন খোলা কাগজকে বলেন, “সরকারি অর্থের অপচয় রোধে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে উপজেলা প্রশাসন। সেই প্রচেষ্টার ফলেই উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।”
ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা নাসরিন কান্তা বলেন, “সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করেই নির্ধারিত সময় এবং বৃষ্টির মধ্যেই প্রকল্পের কাজ করা হয়েছে। কাজে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না হওয়ায় সরকারি বরাদ্দের একটি বড় অংশ সাশ্রয় হয়েছে, যা নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।”
জানা গেছে, পাঁচ উপজেলাতেই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে অব্যয়িত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় রোধের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মো. মাহবুব আলম জানান, খাল পুনঃখননের সময় আশপাশের কৃষিজমির বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কৃষিজমির ক্ষতি এড়িয়ে নির্ধারিত গভীরতা ও প্রস্থ বজায় রেখে অধিকাংশ খালের মূল খননকাজ এক্সকাভেটরের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘প্রকল্পের শর্তে শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টি থাকলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, অনেক শ্রমিক বিদেশে কর্মরত, আবার অনেকে ইটভাটা, নির্মাণকাজ কিংবা শিল্পকারখানায় নিয়োজিত থাকায় সেখানে খাল খননের তুলনায় বেশি মজুরি পান। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় আকারের খাল পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমিক একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব হয়নি।’
মো. মাহবুব আলম আরও বলেন, ‘এ কারণে বর্তমানে দেশের অধিকাংশ বড় ও গভীর খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্পে স্থানীয় শ্রমিকের প্রাপ্যতা, প্রকল্পের পরিধি ও সরকারের নির্ধারিত সময়সীমা বিবেচনায় নিয়ে এক্সকাভেটর (ভেকু) ব্যবহার করা হয়েছে। তবে মূল খননকাজে যন্ত্র ব্যবহার করা হলেও খালপাড়ের মাটি সমান করা, ঢাল ঠিক করা, পরিচ্ছন্নতা ও আনুষঙ্গিক বিভিন্ন কাজে স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়োজিত করা হয়েছে।’
কেকে/এমএ