আগামী আগস্ট মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হতে পারে বলে বিএনপির অভ্যন্তরে জোর গুঞ্জন চলছে। এমন গুঞ্জনে ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে ব্যাপক উৎকণ্ঠা, ব্যস্ততা ও উত্তেজনা।
দীর্ঘদিন মেয়াদোত্তীর্ণ থাকা বর্তমান কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার বিষয়ে দলের শীর্ষ পর্যায়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। সংগঠনের কার্যক্রমে স্থবিরতা, নেতৃত্ব নিয়ে তৃণমূলের অসন্তোষ ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রশিবিরের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা মোকাবিলায় সাংগঠনিক অবস্থান আরও শক্তিশালী, গতিশীল ও যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ আনার আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সম্ভাব্য নেতৃত্বে কারা আসতে পারেন, তা নিয়েও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ও দৌড়ঝাঁপ।
ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এরপরও নতুন কমিটি না হওয়ায় সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, ত্যাগী ও রাজপথের সক্রিয় নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে বর্তমান নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিষ্ক্রিয়দের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, অথচ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা অনেক নেতাকর্মীকে উপেক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিনির্ভর বা অনুসারীকেন্দ্রিক কমিটি গঠন, অছাত্রদের পদায়ন এবং ছাত্রলীগের বিতর্কিত কিছু সাবেক নেতাকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কমিটি বাণিজ্যের গুঞ্জন নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়া এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের দাবির মুখে কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
শীর্ষ পদপ্রত্যাশীদের নিয়ে জল্পনা-কল্পনা
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন ও বর্তমান কমিটি ভেঙে দেওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও নতুন নেতৃত্বের সম্ভাব্য তালিকা নিয়ে আলোচনা করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে। কে হচ্ছেন ছাত্রদলের পরবর্তী সভাপতি, কে পাচ্ছেন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব, আর কারা গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য পদে জায়গা করে নিতে পারেন, তা নিয়ে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ ও জল্পনা-কল্পনা। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের তালিকায় কারা এগিয়ে রয়েছেন, তা নিয়েও নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
সভাপতি পদে আলোচনায় যারা এগিয়ে
সভাপতি পদে বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতার নাম শোনা যাচ্ছে, যারা বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল, যিনি দীর্ঘদিনের রাজপথের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় এই নেতার নাম বর্তমানে বিএনপির শীর্ষ মহলের আলোচনায়ও রয়েছে।
বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান- বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। ছাত্রদল করার অপরাধে তাকে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করতে হয়েছে। তার আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার কথা খোদ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একাধিকবার স্মরণ করেছেন। বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকেও তাকে নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা রয়েছে।
মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ ও এইচএম আবু জাফর- এরা দুইজনেই বর্তমান কমিটির সহসভাপতি। রাজনীতি ও রাজপথের কঠিন দিনগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে তাদের অনুসারীরা তাদের শীর্ষ পদে দেখতে চান।
মোস্তাফিজুর রহমান (ভিপি)- ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ভিপি পদপ্রার্থী ছিলেন এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগের দোসরদের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন নির্যাতন সহ্য করা এই নেতাকে মূল ধারার একটি বড় অংশ নেতৃত্বে দেখতে চায়। এ ছাড়া সহসভাপতি শাফি ইসলাম ও খোরশেদ আলম সোহেলের নামও আলোচনায় রয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক পদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা
সাধারণ সম্পাদক পদটি নিয়েও চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। এই পদে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে তারা হলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন ও মমিনুল ইসলাম জিসান। ৫ আগস্টের সরকার পতনের আন্দোলনে এই দুই নেতা অত্যন্ত সাহসী ও কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ ও মো. তরিকুল ইসলাম তারিক। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মো. আদনান, শামিম আকতার শুভ, মাসুম বিল্লাহ এবং সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্সও জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছেন।
সাংগঠনিক সম্পাদক পদের দৌড়
সাংগঠনিক সম্পাদক পদের দৌড়ে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। এছাড়া সোহেল রানা ও ইব্রাহিম খলিল জোরালোভাবে আলোচনায় আছেন। পাশাপাশি গাজী সাদ্দাম, নাসির উদ্দিন শাওন ও শামিম আক্তার শুভও এই পদের জন্য লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।
নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি
পদপ্রত্যাশী নেতারা নতুন নেতৃত্ব পেলে তাদের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। ইজাজুল কবির রুয়েল বলেন, ‘নেতৃত্বের সুযোগ পেলে ছাত্রদলকে সুসংগঠিত করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সর্বদা সোচ্চার থাকব ও রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করব।’
মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ জানান, সংগঠন ও জনগণের কল্যাণে কেন্দ্রীয় কমিটিতে সুযোগ পেলে তিনি নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন।
ফারুক হোসেন বলেন, ‘ছাত্রদলকে আরও শক্তিশালী ও বেগবান করতে সততার সঙ্গে রাজপথে কাজ করে যাব।’
মোস্তাফিজুর রহমান (ভিপি) আশা প্রকাশ করেন, দায়িত্ব পেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং মেধাভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে ছাত্রদলকে একটি আধুনিক ও গতিশীল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা হবে।
আমান উল্লাহ আমান বলেন, ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দিয়ে ক্যাম্পাসগুলোতে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণে একটি জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতি গড়ে তুলতে আমি বদ্ধপরিকর।’
অঙ্গ সংগঠনগুলোতে শুদ্ধি অভিযান ও সংস্কার
শুধু ছাত্রদলই নয়, বিএনপির নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ দলের অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠনগুলোকেও ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৭ বছরের দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন অথচ ক্ষমতার পালাবদলে যথাযথ মূল্যায়ন পাননি, তাদের উপযুক্ত স্থানে বসানোর মাধ্যমে সংগঠনগুলোকে আরও গতিশীল করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
ছাত্রদলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা মনে করেন, বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও কার্যপদ্ধতির সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেলাতে পারছে না, যা সংগঠনকে স্থবির করে দিয়েছে।
এই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে এবং মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
কেকে/এমএ