পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর গোপন তৎপরতায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) কোনো শিক্ষক জড়িত কি না, তা অনুসন্ধানে গঠিত পাঁচ সদস্যের ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং’ কমিটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য হিসেবে কয়েকজন বিতর্কিত ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. মো. ফেরদৌস রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়।
গঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিউল ইসলাম জীবনকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, শিক্ষার্থীদের মানসিক নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নম্বর টেম্পারিংয়ের মতো অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অতীতে এক শিক্ষার্থী লিখিত অভিযোগও দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, সর্বশেষ সিন্ডিকেটে ড. তানজিউল ইসলাম জীবনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। এ কারণে তাকে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ সিন্ডিকেটে তার (ড. তানজিউল ইসলাম জীবন) বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো ছিল, সেখান থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। আর অব্যাহতি পাওয়ার কারণে তাকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।”
এদিকে কমিটির সদস্য হিসেবে রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. হারুন আল-রশিদকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন ‘নীল দল’-এর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এনে কমিটিতে তার অন্তর্ভুক্তির সমালোচনা করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। তাদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কোনো শিক্ষককে এমন গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী কমিটিতে রাখলে কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তবে ড. হারুন আল-রশিদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, “এখন উনি আমাদের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামে আসছেন, ফরম পূরণ করেছেন এবং আমাদের দলের সদস্য হয়েছেন। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবগুলো অনুষদ থেকে সমন্বয় করে কমিটিতে সদস্য রেখেছে। তাই তাঁকে বিজ্ঞান অনুষদ থেকে রাখা হয়েছে।”
এ বিষয়ে দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে তথ্য যাচাই করে সত্য উদঘাটন করা জরুরি। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার প্রশ্ন রয়েছে, তাদের দিয়ে তদন্ত করানো হলে স্বাভাবিকভাবেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে যাদের নামেই তদন্ত চলমান, তারা কীভাবে অন্যের তদন্তের দায়িত্বে থাকেন, এ বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমরা চাই, রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা হোক।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিই নয়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)সহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা অনুসন্ধান কার্যক্রমে সহযোগিতা করবে।
প্রক্টর বলেন, “এখানে শুধু এই কমিটি নয়, এনএসআই, ডিজিএফআইসহ সরকারি অনেক সংস্থা সহযোগিতা করবে। তাই এই কমিটির প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।”
তবে কমিটির সদস্যদের অতীত ভূমিকা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা তদন্তের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কেকে/সাশ