চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে টানা দুই বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার শূন্য। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে মোট পাঁচজন শিক্ষার্থী অংশ নিলেও একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
চলতি বছর পরীক্ষায় অংশ নেয় তিনজন। মানবিক বিভাগের দুজন ও বিজ্ঞান বিভাগের একজন। তিনজনই অনুত্তীর্ণ হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীরও একই পরিণতি হয়েছিল। ফলে টানা দুই বছর পাসের হার শূন্যের পাশাপাশি বিদ্যালয়টির এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পুরো স্কুল প্রাঙ্গণ প্রায় জনশূন্য। ফল প্রকাশের পরদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল মাত্র দুজন ছাত্রী। শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতিও ছিল খুবই কম। বিদ্যালয়ের কাগজপত্র অনুযায়ী শিক্ষক রয়েছেন আটজন। তবে ওই দিন প্রধান শিক্ষকসহ উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুজন।
বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিবি মরিয়ম শান্তা বলেন, ‘শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস হয় না। বাংলার শিক্ষক থাকলেও গণিত ও ইংরেজির শিক্ষক নেই। ফলে পড়াশোনায় বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে। স্যাররা নিয়মিত থাকলে ঠিকমতো পড়ালেখা হতো। আমরাও পড়াশোনায় মনোযোগী হতাম। এখন সবাই ফেল করছে, কেউ পাশ করছে না। আগে স্কুলটা ভালো ছিল। আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, তখন অনেক শিক্ষার্থী ছিল। এখন বলতে গেলে কোনো শিক্ষার্থীই নেই।’
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসমা আকতার বলেন, ‘স্কুলে শুধু শিক্ষকসংকট নয়, বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও নেই। বিদ্যালয়ে কোনো টিউবওয়েল না থাকায় পানি সংগ্রহের জন্য পাশের বাড়িতে যেতে হয়।’
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে ৮৪ শতক জমির ওপর স্থানীয় কয়েকজনের উদ্যোগে শওকত সিকদার নামে এক ব্যক্তি নারায়ণহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেন। এ অঞ্চলে নারীশিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলেন। প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ২০০৪ সালে পাঠদানের অনুমোদন পায়। ২০০৬ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্বীকৃতি এবং ২০০৮ সালে পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রতিষ্ঠার ২৬ বছর পার হলেও বিদ্যালয়টি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এমপিওভুক্ত না হওয়ায় বিদ্যালয়ের আর্থিক সংকট দীর্ঘদিনের। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে।এসএসসি ফলাফলের পরিসংখ্যানও সেই সংকটের চিত্র তুলে ধরে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি থেকে মোট ২৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে ১৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ আগের বছরগুলোতে ফলাফল একেবারে খারাপ ছিল না। কিন্তু ২০২৫ সালে দুই পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি। ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থী বেড়ে তিনজন হলেও ফলাফলের কোনো উন্নতি হয়নি।
বিদ্যালয়ের সত্তরোর্ধ্ব প্রধান শিক্ষক সুখেন্দ্র বিকাশ দে বলেন, ‘শিক্ষকসংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে এনটিআরসির মাধ্যমে দক্ষ ও মানসম্মত শিক্ষক পাওয়া যাবে। এতে পাঠদানের মানও বাড়বে। বর্তমানে শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা দিতে না পারায় তাদের ওপর সেভাবে চাপ প্রয়োগ করাও সম্ভব হয় না।’
নিজের বয়স ও নানা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এ অঞ্চলের নারীশিক্ষার কথা বিবেচনা করেই তিনি প্রতিষ্ঠানটি ধরে রেখেছি। বৃদ্ধ বয়সেও নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।’
ফটিকছড়ি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষক-কর্মচারী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফলও আসছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন বয়োবৃদ্ধ প্রধান শিক্ষক নিজের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি ধরে রেখেছেন। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কী কী সমস্যার কারণে বিদ্যালয়টিতে এমন ফলাফল হচ্ছে, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
কেকে/এআই