অর্থের অভাবে দেশের কোনো নাগরিক যাতে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যেই সরকার একটি কল্যাণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য কোনো নাগরিককে দেশের বাইরে যেতে হবে না এবং অর্থের অভাবে কেউ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালের সম্প্রসারিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ভবন-২ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শনিবার সকালে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে নতুন ভবনটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেন। তিনি অপারেশন থিয়েটার ও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) ঘুরে দেখেন এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও রোগীদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয় বরং উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক, রোগী ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। চিকিৎসকরা যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন কিংবা রোগী ও স্বজনরা চিকিৎসকদের ওপর আস্থা ও মর্যাদার সম্পর্ক অনুভব না করেন, তাহলে হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতই করা হোক, চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ করা যাবে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্ট্রোক, ইপিলেপসি বা খিঁচুনি, পারকিনসন্স ডিজিজ, ডিমেনশিয়া এবং মেরুদণ্ডের জটিল রোগসহ নিউরোলজিক্যাল রোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এসব রোগের আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধনের মাধ্যমে এসব রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে। আধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, সর্বাধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা ও বিশেষায়িত ওয়ার্ডসমৃদ্ধ ভবনটি শুধু রোগী ভর্তির সক্ষমতা বাড়াবে না, চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষ যেন স্বল্প খরচে বিশ্বমানের নিউরোচিকিৎসা পান, সেই লক্ষ্যেই ‘নিউরোসায়েন্স-২’ নির্মাণ করা হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, অতিরিক্ত শয্যা ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা দেশের হাজারো রোগীর জন্য আশার আলো বয়ে আনবে।’
স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মানবিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই। রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ, মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা, মানসিক অবস্থা বোঝা এবং সম্মানজনক আচরণ চিকিৎসার মান অনেক বাড়িয়ে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসার পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের একার নয়। চিকিৎসক, রোগী ও রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন, এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির সম্পর্ক থাকা জরুরি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিকার শুধু মৌলিক অধিকার নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেরও চাবিকাঠি। স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও সবার জন্য সমানভাবে প্রাপ্য হওয়া জরুরি। উন্নত চিকিৎসা শুধু শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বলা যায় না।’
প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন,‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগী যাতে চিকিৎসার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে আসতে বাধ্য না হন, সে জন্য ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে আধুনিক ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হবে।
শিশুস্বাস্থ্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সুস্থ আগামী’ বিনির্মাণে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের পাশাপাশি সরকার শিশুস্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।’
তিনি জানান, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং কুমিল্লা জেলায় একটি করে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর কাজ শুরু হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসে একযোগে পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে সরকার প্রমাণ করেছে, ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য শুধু স্লোগান নয়। দেশে এমন একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে মানুষ দেশের ভেতরেই সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে।
তবে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষকসহ স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কেকে/এলএ