গাজীপুর মহানগরের পূবাইল থানার মিরের বাজারে অবস্থিত ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসক না থাকার অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসকের দেখা না পেয়ে অনেক রোগী ও স্বজনকে ফিরে যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সরকারি এ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে প্রত্যাশিত সেবা না পাওয়ায় ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বুধবার (১৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রধান ফটক খোলা রয়েছে। তবে ভেতরে ছিল নীরব পরিবেশ। এ সময় কয়েকজন নারী, শিশু ও পুরুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। কেউ চিকিৎসকের খোঁজ করছিলেন, আবার কেউ পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন। তবে চিকিৎসকের কক্ষটি খালি থাকায় কয়েকজন রোগীকে ফিরে যেতে দেখা যায়। সে সময় মেডিকেল অফিসার ডা. ফারজানা হককে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলার কথা। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ নিয়মিত ও যথাসময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত হন না। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশেই তিনতলা একটি ডরমিটরি রয়েছে। সেখানে মেডিকেল অফিসার, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে সংশ্লিষ্ট সবাই নিয়মিত অবস্থান করেন না।
পূবাইল বাজার, কুদাব, বসুগাঁও, নারায়ণকুল, হারবাইদ ও তালটিয়াসহ আশপাশের এলাকার মা, শিশু ও কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এখানে নিয়মিত চিকিৎসক না থাকায় অনেককে উপজেলা সদর কিংবা গাজীপুর জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
ষাটোর্ধ্ব আমেনা বলেন, ‘এলাকার মা ও শিশুদের জন্য সরকার হাসপাতালটি করেছে। কিন্তু এখানে ডাক্তার নিয়মিত থাকেন না, ওষুধেরও সংকট রয়েছে। আমরা চাই নিয়মিত ডাক্তার আসুক এবং মা ও শিশুরা এখান থেকেই সেবা পাক।’
স্থানীয় পোশাক কারখানার কর্মী মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘শারীরিক সমস্যা নিয়ে এ মাসে অন্তত তিনবার হাসপাতালে এসেছি। এসে দেখি ডাক্তার নেই। বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার মতো সামর্থ্য আমার নেই।’
তালটিয়া এলাকার বাসিন্দা আয়েশা তার ছোট ছেলেকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার না থাকায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। মাঝেমধ্যে ডাক্তার পাই, আবার মাঝেমধ্যে পাই না। এখানে বিনা খরচে চিকিৎসা পাওয়া যায় বলেই বারবার আসি।’
শাহিন মোল্লা বলেন, ‘গ্রামীণ এলাকার গর্ভবতী মা, নবজাতক ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্যই এই কেন্দ্র করা হয়েছে। সেখানে যদি নিয়মিত চিকিৎসক না থাকেন, তাহলে সেবাপ্রত্যাশীরা কার কাছ থেকে চিকিৎসা নেবেন?’
তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নাজমুন নাহার নিপা জানান, তিনি সংযুক্তিতে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দায়িত্বে অবহেলা করেন না।
তিনি বলেন, ‘রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে থেকে নরমাল ডেলিভারি করাই এবং কোয়ার্টারে থাকি। আমার সঙ্গে দুই-একজন সহকারী থাকলে কাজের চাপ কিছুটা কমত।’
হাসপাতালে অনিয়মিত আসার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডা. ফারজানা হক। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সত্য নয়। হাসপাতালে রোগীরা সাধারণত ১০টার পর আসেন, যে কারণে আমিও কখনো কখনো দেরিতে যাই। সব রোগী আমি দেখি না; গুরুত্বপূর্ণ রোগীদের দেখি।’
গতকাল বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুর ১২টার পর হাসপাতালে আসার কারণ জানতে চাইলে ডা. ফারজানা হক বলেন, ‘আমি গাজীপুর সদরে ছিলাম। আমার ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে গাজীপুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু তাহের মো. সানাউল্লাহ নূরী বলেন, ‘ডা. ফারজানা হককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে অনিয়মিত অফিস করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, ‘বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এআই