সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬,
৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৯৯৪, মৃত্যু তিনজনের      হামে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২৩২      মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা কারাগারে      জামায়াত বিসমিল্লাহ বলে মিথ্যা শুরু করে : রাশেদ      নুসরাত হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল      ব্যবসায়িক সম্পর্ক এগিয়ে যাক, রাজনীতি চলবে নিজের পথে : দীনেশ ত্রিবেদী      রংপুরে শিক্ষক ও স্ত্রী-সন্তানদের শেষকৃত্য সম্পন্ন      
খেত খামার
চাকরি ছেড়ে কৃষিতে, ইখতেয়ারের খামারে তৈরি হচ্ছে কেঁচো সার
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৫:১৮ পিএম

বিসিএস ক্যাডারে চাকরির সুযোগ, সরকারি কলেজে শিক্ষকতার সম্ভাবনা, একাধিক ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—সবই ছিল ইখতেয়ার উদ্দিন আহমেদ মুন্নার সামনে। চাকরির পাশাপাশি ব্যবসার পথও খোলা ছিল। কিন্তু এসবের কোনোটিই শেষ পর্যন্ত তাকে আটকে রাখতে পারেনি। নিজের এলাকার কৃষি ও মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদে নিরাপদ চাকরি ছেড়ে তিনি নেমেছেন কৃষির মাঠে।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরটেকী গ্রামে প্রায় দুই বছর আগে গড়ে তোলেন ‘এমএম এগ্রো’ নামে সমন্বিত কৃষি খামার। এখানে একই সঙ্গে চলছে মাছ চাষ, মুরগি পালন, গরু মোটাতাজাকরণ, নেপিয়ার ঘাস ও সবজি চাষ এবং ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন। খামারের একটি প্রকল্পের বর্জ্যই আবার অন্য প্রকল্পের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কমছে উৎপাদন খরচ, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান; পাশাপাশি জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষারও চেষ্টা চলছে।

চাকরি থেকে কৃষির মাঠে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষে ২২তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুযোগ পান ইখতেয়ার। তার পোস্টিং হয়েছিল কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজে। তবে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ না দিয়ে ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হন তিনি।

ইউসিবিএল, পূবালী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে কাজ করেছেন। ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৬ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় যুক্ত হন। ঠিকাদারি, কনস্ট্রাকশন ও গার্মেন্টস ব্যবসাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। সেই ভাবনা থেকেই চরটেকীতে শুরু করেন এমএম এগ্রো।

ইখতেয়ার বলেন, ‘আমি মূলত কমার্শিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ। কৃষিতে আগে থেকে খুব বেশি অভিজ্ঞতা ছিল না। এখানে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। কোনো কিছু করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে শিখেছি। এই শেখাটাকেই আমি ভবিষ্যতের বিনিয়োগ মনে করি।’

এক খামারে অনেক প্রকল্প

প্রায় ১৮ থেকে ২০ বিঘা জমিকে কেন্দ্র করে চলছে এমএম এগ্রোর কার্যক্রম। রয়েছে চারটি ফিশারি। এসব পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। আছে প্রায় দুই হাজার ফাওমি মুরগি। চলছে ষাঁড় গরু মোটাতাজাকরণ। গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য চাষ করা হচ্ছে নেপিয়ার ঘাস। পাশাপাশি গবাদিপশুর বর্জ্য ও জৈব উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার।

তবে ইখতেয়ারের উদ্যোগের বিশেষত্ব শুধু একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্প চালানো নয়। তার পরিকল্পনা হলো, একটি প্রকল্পের উৎপাদিত উপকরণ যেন অন্য প্রকল্পে কাজে লাগে।

নেপিয়ার ঘাস গরু-ছাগল ও গ্রাস কার্পের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। গবাদিপশুর বর্জ্য ও অন্যান্য জৈব উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরিতে। অর্থাৎ খামারে বর্জ্যও হয়ে উঠছে সম্পদ।

ইখতেয়ার বলেন, ‘১০ টাকায় কিনে ৯ টাকায় বিক্রি করলে যত ব্যবসাই করেন, কোনো লাভ নেই। তাই কীভাবে উৎপাদন খরচ কমানো যায়, সেটাই বড় বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। তাই কৃষিনির্ভরতা আরও বাড়ানো এবং কৃষিকে আরও উন্নত করা দরকার। আমি মনে করি, এটিই প্রকৃত উন্নয়ন—কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন।’

মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কেঁচো সার

এমএম এগ্রোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ভার্মি কম্পোস্ট। গবাদিপশুর বর্জ্য ও বিভিন্ন জৈব উপাদান ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে এই সার। উদ্যোক্তার কাছে এটি শুধু ব্যবসার একটি খাত নয়; কৃষির ভবিষ্যতের সঙ্গেও বিষয়টি জড়িত।

ইখতেয়ার বলেন, ‘আমাদের মাটিতে জৈব উপাদান কমে যাচ্ছে। মাটির স্বাস্থ্য ঠিক না রেখে কৃষির উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমি চাই, ভার্মি কম্পোস্ট শুধু আমার খামারে নয়, ঘরে ঘরে তৈরি হোক।’

বর্তমানে এ প্রকল্পের উৎপাদন বাড়ানোর কাজ চলছে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে কেঁচো সার বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

খামার ঘিরে কর্মসংস্থান

এমএম এগ্রো এখন স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানেরও জায়গা। খামারের বিভিন্ন প্রকল্পে স্থায়ী ও স্থানীয় মিলিয়ে প্রায় আটজন কাজ করছেন। এর বাইরে ভার্মি কম্পোস্ট প্রকল্পসহ বিভিন্ন কাজে আরও স্থানীয় যুবকের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

খামার পরিচর্যা কর্মী রবি বলেন, ‘এখানে গরু, মাছ, ভার্মি কম্পোস্ট ও মুরগির প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজে প্রায় আটজন যুক্ত আছি। এর মধ্যে ছয়জন স্থায়ীভাবে কাজ করেন, আর স্থানীয় আরও দুজন রয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বেতন পাই। প্রয়োজন হলে মাস শেষ হওয়ার আগেও বেতন থেকে অগ্রিম নিতে পারি। ঘাস কাটা, গোবর সংগ্রহ, জৈব সার তৈরির উপকরণ সংগ্রহ, মুরগিকে খাবার ও পানি দেওয়া—এসব কাজ করতে হয়।’

কর্মী রিপন বলেন, ‘আমি এখানে প্রায় এক বছর ধরে কাজ করছি। এই কাজ করে আমার চার সদস্যের পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারছি। খামারটি যত বড় হবে, তত বেশি মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে।’

পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাজ

খামারে শুধু পূর্ণকালীন কর্মীরাই নন, পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও কাজ করছেন। পাকুন্দিয়া ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী নিলয় তাঁদের একজন।

নিলয় বলেন, ‘আমার দাদা এখানে কাজ করেন। তাঁর সঙ্গে আমিও কলেজের সময়ের ফাঁকে ফাঁকে এখানে কাজ করি। এখানে আমার মতো আরও চার-পাঁচজন শিক্ষার্থী আছে, তারাও পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে।’

তিনি বলেন, ‘এই কাজ থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে আমরা নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারি। নিজেরা কিছুটা আয় করে পড়াশোনার খরচ দিতে পারছি—এতে আমরা সত্যিই আনন্দিত।’

ব্যবস্থাপনায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য

খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য বদিউল আলম। ২০১৫ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হন।

বদিউল আলম বলেন, ‘কে কী কাজ করছে, কোন জায়গায় কী করতে হবে—সবকিছুর দেখাশোনার দায়িত্ব আমার। এক কথায়, পুরো খামার পরিচালনার দায়িত্ব আমি পালন করছি।’

কেঁচো সার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা যে সার উৎপাদন করছি, কৃষকরা সেটা ব্যবহার করলে ভালো ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।’

ইখতেয়ারের বড় ভাই ইলিয়াস উদ্দিন চুন্নুর চোখে, চাকরির নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছেড়ে কৃষিতে আসার পেছনে তার ভাইয়ের ঝুঁকি নেওয়ার সাহসই সবচেয়ে বড় বিষয়।

তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ভাই বিসিএস ক্যাডার ও ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা ছিল। সেই নিরাপদ জায়গাগুলো ছেড়ে নিজের এলাকার উন্নয়নের জন্য কিছু করার পরিকল্পনা থেকেই কৃষিতে এসেছে।’

তবে এখনো কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখেননি তারা। ইলিয়াস উদ্দিন চুন্নু বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা লাভের মুখ দেখছি না। কিন্তু সে বলে, পিছু হটব না। একবার না পারলে শতবার চেষ্টা করব। দেখতে দেখতে একসময় সফলতা আসবে।’

কৃষি বিভাগের আশাবাদ

পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে-ই-আলম বলেন, ‘ইখতেয়ার উদ্দিনের এই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। তার উদ্যোগের কারণে ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ থেকে ৩০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ভার্মি কম্পোস্ট প্লান্টে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ জন যুবক কাজ করছেন।’

তিনি বলেন, ‘কৃষির গুণগত পরিবর্তন ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় জৈব উপকরণও এখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও স্থানীয় যুবকেরা যুক্ত হয়েছেন। ফলে একদিকে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে এটি একটি উৎপাদনশীল কৃষি খামার হিসেবেও গড়ে উঠছে।’

সামনে আরও বড় স্বপ্ন

এখনো নিজের উদ্যোগকে সফল বলে মনে করছেন না ইখতেয়ার। বরং ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত কৃষি মডেল গড়ে তুলতে চান তিনি। ভবিষ্যতে ডেইরি ও আরও কিছু কৃষিভিত্তিক প্রকল্প যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

ইখতেয়ার বলেন, ‘অন্যান্য ব্যবসা থাকার পরও কৃষির প্রতি আমার আগ্রহ বেশি। আমি চাই, এটাকে আরও বড় করা যায়। একদিনে কিছু হয়নি। আস্তে আস্তে একটার পর একটা প্রকল্প যুক্ত করেছি। সামনে আরও বড় করার ইচ্ছা আছে।’

চাকরির নিরাপদ পথ ছেড়ে কৃষিতে আসা ইখতেয়ারের এমএম এগ্রো এখনো সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায়নি। তবে মাছ, গরু, মুরগি, ঘাস ও কেঁচো সারকে একই উৎপাদনচক্রে যুক্ত করে তিনি যে পথ তৈরি করছেন, তাতে একদিকে কৃষির নতুন সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে স্থানীয় মানুষের কাজের সুযোগ। তাঁর স্বপ্ন—এই ছোট উদ্যোগ একদিন বড় হবে, আর সেই সঙ্গে বড় হবে মাটি ও মানুষের জন্য কিছু করার পরিসর।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খেত খামার- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close