মরুভূমির প্রাণী দুম্বা বাংলাদেশের মাটিতে পালন করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে যুবক রবিউল ইসলাম। দুটি দুম্বা দিয়ে শুরুর সফলতায় সাড়ে তিন বছরে তার খামারে বিচরণ ৬৫ দুম্বা। এ সব দুম্বার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় কোটি টাকা।
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের কাঠারিপাড়া গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান রবিউল ইসলাম। এসএসসি পাশের পর কাজের সন্ধানে পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন দেশের বাইরে। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় ভাটা পড়ে সে
সিদ্ধান্তের। এরপর ভাবতে শুরু করেন এলাকায় ব্যতিক্রম কিছু একটা করার। এমন ভাবনা থেকে শুরু করেন দুম্বা পালন।
দুম্বা পালন শিখেছেন ফেসবুক-ইউটিউব দেখে। ফেসবুক ও ইউটিউবে দুম্বা পালনের বিভিন্ন ভিডিও দেখে এ প্রাণীর পালনে
আগ্রহ তৈরি হয় রবিউলের। পরে প্রবাসী বড় ভাইয়ের পরামর্শে তুর্কি জাতের দুম্বা সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। পরীক্ষামূলভাবে দুটি দুম্বার পালনের সফলতায় আরও সংগ্রহ করেন ছয়টি। মোট আটটি দুম্বা সংগ্রহে তার খরচ হয় ১২ লাখ টাকা।
রবিউল জানান, ছয়মাসের মধ্যেই এ সব দুম্বা বাচ্চা দিতে শুরু করে। এরপর প্রজননের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দুম্বার সংখ্যা। সাড়ে তিন বছরে তার খামারে বিচরণ করছে ৬৫ দুম্বা। সবুজ ঘাস আর খৈল ভুসি এ সব দুম্বার প্রধান
খাবার। ওই ৬৫ দুম্বা পরিচর্যায় তার খামারে কাজ করছেন পাঁচজন কর্মচারী।
রবিউলের ভাষ্য, একটি দুম্বার ওজন ৫০-১০০ কেজি পর্যন্ত হয়। বয়স, ওজন ও আকৃতি অনুযায়ী প্রতিটি দুম্বা দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।
রবিউল বলেন, ‘দুম্বার পছন্দের খাবার কাঁচা ঘাস। ঘাস, খৈল-ভুসিসহ প্রতিদিন একটি দুম্বার খাবারের পেছনে খরচ ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত। রোগবালাই খুব কম হয়। সময়মতো খাবার এবং রোগ প্রতিরোধের টিকা দিলে ঠিকমতো বেড়ে ওঠে।’
প্রতিটি দুম্বা বছরে দুইবার করে বাচ্চা দেয়। প্রতিবার একটি থেকে দুটি পর্যন্ত বাচ্চা পাওয়া যায়। তিনমাস বয়সে একটি বাচ্চার ওজন ৩৫-৪০ কেজি পর্যন্ত হয়। এ বয়সের একটি বাচ্চার বাজার মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। দুম্বার খামারে কর্মসংস্থান হয়েছে পাঁচজনের।
এক সময় নিজের কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চতায় ছিলেন রবিউল ইসলাম। দুম্বার খামার বদলে দিয়েছে তার জীবন। এখন নিজে পার করছেন কর্মব্যস্ত জীবন। তেমনি তার ওই খামারে কর্মসংস্থান হয়েছে এলাকার পাঁচ শ্রমিকের।
খামারের কর্মচারী কালু মিয়া বলেন, ‘রবিউল ভাইয়ের দুম্বার খামারের কারণে আমার মতো পাঁচটি পরিবারের সদস্যদের আহার জুটছে। এর পরিধি বাড়লে আরও মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’
তিনি জানান, প্রতিদিন শত শত মানুষ খামার দেখতে আসেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাই দুম্বা পালনে আগ্রহী হচ্ছেন। এলাকায় ব্যাপকতা বাড়লে আরও মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কোরবানি ঘিরে দুম্বার প্রতি আগ্রহ বাড়ে মানুষের।
রবিউল জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দুম্বা ক্রেতারা ফোন করছেন। অনলাইনে অনেকে দুম্বা দেখতে চাচ্ছেন। আবার অনেকে এর পালন পদ্ধতি শিখতে চাচ্ছেন। তবে কোরবানি ঘিরে দুম্বার প্রতি আগ্রহ বাড়ে মানুষের।
তিনি বলেন, ‘কোরবানির জন্য গ্রাহকদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। সারাদেশ থেকে ফোন কল আসছে। বেশিরভাগ মানুষ অনলাইনে দুম্বা দেখতে চাচ্ছেন। তাই বিক্রি নিয়েও কোনো চিন্তা নেই।’
এ বিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা প্রণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবু কায়েস বিন আজিজ বলেন, ‘দুম্বা পালনে রবিউলের সাফল্য অনেক। তাকে অনুরণ করে অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন দুম্বা পালনে। সৈয়দপুরের কাঠারিপাড়ার সবুজ মাঠে এখন তাই মরুর প্রাণী দুম্বার বিচরণ। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন সেই দৃশ্য দেখতে। কেউ কৌতূহলি হয়ে, কেউ ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজতে, আবার কেউ কোরবানির পশু হিসেবে দুম্বা কিনতে।’
রবিউলের খামারের গল্প তাই শুধু দুটি দুম্বা থেকে ৬৫টি দুম্বায় পৌঁছানোর গল্প নয়; এটি নতুন ধরনের পশুপালনে একজন তরুণের আগ্রহ, পরিশ্রম ও উদ্যোগেরও গল্প।
কেকে/এআই