একসময় যে পাট ছিল বাংলার অর্থনীতির অন্যতম প্রাণ। সেই ‘সোনালি আঁশ’ এবার যেন নতুন করে হাসি ফুটিয়েছে ফরিদপুরের কৃষকের মুখে। সবুজ মাঠ পেরিয়ে পাট এখন উঠেছে হাটে। পচানো, ধোয়া ও শুকানোর পর পরিপক্ব আঁশের গন্ধে মুখর জেলার হাট-বাজার। আর ভালো ফলনের সঙ্গে বাজারে চড়া দাম—দুইয়ের সমন্বয়ে এ বছর পাটচাষিদের ঘরে ফিরছে স্বস্তি।
চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে পাটের আবাদ হয়েছে ফরিদপুরে। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত পানি এবং কৃষকদের যথাযথ পরিচর্যায় শুধু ফলনই নয়, পাটের আঁশের রং ও গুণগত মানও হয়েছে বেশ ভালো।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন পাট উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে ফরিদপুর থেকেই কৃষকদের পাট বিক্রির সম্ভাব্য আয় ২২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে ৮৭ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে প্রায় ৮৭ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের পরিচর্যায় বড় ধরনের কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়নি। পাশাপাশি পাট জাগ দেওয়ার সময় খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকায় আঁশের মানও হয়েছে চমৎকার।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে কানাইপুর হাটসহ জেলার বিভিন্ন প্রধান পাটের হাট ঘুরে দেখা যায়, নতুন পাটের বেচাকেনায় বেশ প্রাণচাঞ্চল্য। হাটে কৃষকের ভিড়, পাটের স্তূপ আর দরদামে ব্যস্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁক-ডাকে মুখর চারপাশ।
গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় পাটের দরও বেড়েছে। কানাইপুর, তালমা, কাদিরদী, সাতৈর ও বড়গাসহ জেলার বিভিন্ন হাটে বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট প্রায় ৪ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো দাম পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন কৃষকরা। বছরের পর বছর মাটি, পানি, রোদ আর শ্রমের সঙ্গে লড়াই করে যে ফসল ঘরে তুলেছেন, এবার তার ন্যায্য মূল্য মিলছে—এটাই যেন তাদের মুখের হাসির সবচেয়ে বড় কারণ।
ফরিদপুর সদর উপজেলার পাটচাষি লাভলু মিয়া বলেন, ‘এবার পাট ও আঁশ দুটোই চমৎকার হয়েছে। সার, কীটনাশক আর সেচ খরচ কিছুটা বেশি হলেও বাজারে ৪ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পেরে খুব খুশি। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও এবার ভালো লাভ থাকছে।’
আরেক কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পাটের ভালো দাম পাওয়ায় সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা এবং আগের দেনা মেটানো সহজ হয়ে গেছে। এমন দাম পুরো মৌসুমজুড়ে থাকলে আমাদের মতো পাটচাষিদের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।’
তবে বাজারে পাটের চড়া দাম স্বস্তি যেমন এনেছে কৃষকের জীবনে, তেমনি কিছুটা চাপ তৈরি করেছে ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর। হাটে নতুন পাটের আমদানি কিছুটা কমে যাওয়ায় কৃষকদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি দামে পাট কিনতে হচ্ছে তাদের। ফলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত দাম পেলেও মিল বা ফ্যাক্টরিতে সরবরাহ করার পর আগের মতো মুনাফা থাকছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কানাইপুর হাটের ব্যবসায়ী লিয়াকত মুন্সি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগেও আমরা ৪০০০-৪২০০ টাকা মণ দরে পাট কিনেছি। এখন হাটে পাটের সরবরাহ কম থাকায় কৃষকদের কাছ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। এতে কৃষকরা ভালো লাভ পাচ্ছেন। তবে বিভিন্ন ফ্যাক্টরি ও মিলে বিক্রি করে তেমন লাভ থাকছে না।’
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শাহদুজ্জামান জানান, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের সঠিক পরিচর্যার কারণে এবার জেলাজুড়ে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। পাশাপাশি আঁশের গুণগত মানও ভালো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে থাকা এবং কৃষকদের সঠিক পরিচর্যার ফলে এ বছর পাটের বাম্পার ফলন ও ভালো গুণগত মান অর্জন সম্ভব হয়েছে। বাজারে বর্তমান চড়া দাম বজায় থাকলে ফরিদপুর থেকে ২২০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হবে।’
কৃষি বিভাগের এ কর্মকর্তা মনে করেন, পাট বিক্রি থেকে বড় অঙ্কের অর্থ কৃষকের হাতে গেলে তা শুধু কৃষকের পরিবারেই স্বস্তি আনবে না, এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। কৃষকের আয় বাড়লে বাড়বে ক্রয়ক্ষমতা, সচল হবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।
ফরিদপুরের মাঠে তাই এখন শুধু পাটের আঁশ নয়, কৃষকের স্বপ্নও শুকাচ্ছে রোদে। হাটে হাটে সোনালি আঁশের স্তূপ যেন বলে দিচ্ছে—মাটির সঙ্গে যে মানুষের বন্ধন, তার গল্প কখনো পুরোনো হয় না। ভালো ফলন আর ন্যায্য দাম মিললে সেই মাটিই কৃষকের ঘরে এনে দিতে পারে স্বচ্ছলতার আলো।
এবার ফরিদপুরের পাটের মাঠে সেই আলোরই যেন দেখা মিলছে। সোনালি আঁশের রঙে রাঙা হচ্ছে কৃষকের মুখ, আর তার সঙ্গে আশার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।
কেকে/এআই