বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬,
১২ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: সাগর-রুনি হত্যা : তদন্ত প্রতিবেদন জমা ফের পিছিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর      নেপালে বন্যা-ভূমিধসে প্রাণহানিতে রাষ্ট্রপতির শোক      মক্কা চুক্তি নিয়ে কারও শ্বাসকষ্টের প্রয়োজন নেই : শফিকুর রহমান      দুর্নীতির ১৫ মামলায় মির্জা আব্বাস খালাস      ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই নেপালে আকস্মিক বন্যা: ইউএসজিএস      নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৭      নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫      
আইন-আদালত
রংপুরের চার হত্যা : বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২৫ পিএম আপডেট: ২৭.০৮.২০২৬ ৩:২৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ বলছে, ঘটনার আগে আসামিরা ইয়াবা সেবন করেছিলেন। পরে ভোরে ছাদে গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে মুখোমুখি হলে পরিস্থিতি হত্যাকাণ্ডে গড়ায়।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান। 

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, “একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তে বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে দুজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।”

এ সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এবং সাক্ষীদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

পুলিশ কমিশনার বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সীমান্ত দাস বলেছেন, তিনি একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। আর সিদ্ধার্থ দাস স্বর্ণের দোকানের কারিগর হিসেবে কাজ করেন। গণপতি চক্রবর্তী স্যারের বাড়ির সঙ্গে সিদ্ধার্থদের বাড়ি লাগোয়া ছিল। গণপতি স্যার যে জমিতে বাড়ি করেছিলেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের জমি ছিল। পরে গণপতি স্যার জমিটি কিনে বাড়ি করেন।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি আগে মাঝেমধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করতেন। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে ইয়াবা সেবন করতেন। সিদ্ধার্থের বড় ভাইয়ের সম্প্রতি বিয়ে হয়। এরপর নানা কারণে তিনি প্রায় ছয়-সাত মাস ধরে বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমাতেন। সেখানে খাওয়া-দাওয়াও করতেন। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার তিনি সাক্ষী সীমান্তদের বাসায় থাকতেন। সীমান্ত নেশা করেন না। ঘটনার বিষয়েও তিনি কিছু জানতেন না। আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর তিনি ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধকে সঙ্গে করে সীমান্তদের বাসায় যান। সেখানে দুজন মিলে তিনটি ইয়াবা সেবন করেন। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে তারা ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। এরপর শান্তর বাড়ির সামনে থেকে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন। ইয়াবা নেওয়ার সময় তাঁরা মোবাইল ফোন বন্ধক রেখেছিলেন। চারটি ইয়াবা নেওয়ার পর তাঁরা আবার সীমান্তদের বাসায় যান। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হন।

রাস্তায় কুকুর থাকায় তারা সরাসরি গেট দিয়ে না গিয়ে দেয়াল টপকে দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন। দেবুদের বাড়ির ছাদে রেলিং নেই। তাই তাঁরা ওই ছাদ থেকে গণপতি স্যারের বাড়ির ছাদে যান। দুই ছাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট।

গণপতি স্যারের ছাদের চারপাশে হাফওয়াল ছিল। ফলে বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তাঁরা ইয়াবা সেবন শুরু করেন। তাঁরা ইয়াবা সেবন করতে করতে খেয়াল করেননি কখন ভোর হয়ে গেছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর তারা ওই বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেন। এর মধ্যে সিদ্ধার্থ ভাগে পান ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ওই টাকা দিয়ে তিনি শান্তর কাছ থেকে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। ওই ইয়াবা ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত তাঁকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। মুগ্ধের জবানবন্দিতে অবশ্য সেদিন নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা এসেছে। এটি আটটি ও পরে আরও একটি ইয়াবা সেবনের হিসাব হতে পারে।

ভোরে গণপতি চক্রবর্তী স্যার ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাঁদের দেখে ফেলেন। তিনি তাঁদের ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ তখন তাঁরা ভয় পেয়ে যান। তাঁদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, স্যার চিৎকার করবেন। এরপর তাঁরা স্যারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন বলে জবানবন্দিতে এসেছে। সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্যারের গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন। একপর্যায়ে স্যার মারা যান।

পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে শ্বাসরোধজনিত মৃত্যুর বিষয়টি উঠে আসে। তাঁদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের ওই তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।

স্যারের মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় সম্ভবত শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ স্যারের স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ স্যারের মেয়ের গলা চেপে ধরেন। একপর্যায়ে স্যারের স্ত্রীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই মেয়েটির গলায় প্যাঁচ দেওয়া হয়। পরে পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয়। এভাবে মা ও মেয়েকেও হত্যা করা হয়।

এরপর বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না, সেই আশঙ্কা থেকে তারা নিচতলায় যান। সেখানে একটি পুরোনো প্লাস পান। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন, যাতে কোনো ক্যামেরা থাকলেও সেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে তারা আবার ছাদে যান। মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে রেখে দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দেবুদের বাড়ির ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়।

এরপর তারা স্যারের ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে গেছে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে এবং বলে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’

পুলিশ কমিশনার বলেন, “এর আগে আমরা শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে যে তথ্য পেয়েছিলাম, তখন সেই তথ্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তাঁরা বলেছেন, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলে এবং তার নাম ধরে ডাকে।”

শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় তারা তাকে হত্যা করেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, কাপড় দিয়ে শিশুটির গলায় প্যাঁচ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। এরপর তাঁরা দুজনই অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তারা গোসল করেন। গোসলের পর তাঁদের কাছে থাকা আরেকটি ইয়াবা সেবন করেন।

এরপর মুগ্ধের মাথায় বাড়িটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা আসে। তারা ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করতে থাকেন। মুগ্ধ বিভিন্ন অলংকার এনে দেন। সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন। বাড়ি থেকে তাঁরা ১৫ হাজার টাকা নেন।

জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা স্যারের বাড়ির ছাদ থেকে দেবুদের বাড়ির ছাদে যান। এরপর দেয়াল টপকে বাইরে বের হয়ে যান। মুগ্ধ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান। আর স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে সিদ্ধার্থ একটি গলিতে যান। পরে কাউকে বুঝতে না দিয়ে পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পেছনে মাটির নিচে স্বর্ণালংকারগুলো রেখে দেন। বিজয় কাকা ও পূর্ণিমা কাকি এসব বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

এরপর সিদ্ধার্থ বাড়িতে গিয়ে আবার গোসল করেন। পরে মুগ্ধের কাছে গিয়ে তার ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেন। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। পরদিন সিদ্ধার্থ স্বাভাবিকভাবে দোকানে কাজে যান। অন্যদিকে মুগ্ধ বাড়িতেই ছিলেন। পরে পুলিশ মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে।

মুগ্ধ দাসের আদালতের জবানবন্দিতেও ঘটনার প্রায় একই বর্ণনা পাওয়া গেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২১ তারিখ রাত আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াবা সেবনের জন্য তাঁরা দেবুদের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। দেবুদের বাড়ির নিচতলার নির্মাণকাজ তখনও শেষ হয়নি। সিঁড়িতে কোনো দরজা ছিল না। ফলে সেখানে সহজেই যাতায়াত করা সম্ভব ছিল। ছাদটিও খোলা ছিল।

মুগ্ধের বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থের পরামর্শেই তারা গণপতি স্যারের ছাদে যান। সিদ্ধার্থ তাকে বলেছিলেন, এর আগেও তিনি ওই ছাদে এক-দুই দিন ইয়াবা সেবন করেছেন।

গণপতি স্যারের ছাদে পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করেন। মুগ্ধের হিসাবে সেদিন মোট নয়টি ইয়াবা সেবন করা হয়। এরপর ভোরের আলো ফুটে যায় এবং গণপতি স্যার তাদের দেখে ফেলেন। এরপর একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। সেই চিৎকারের বিষয়ে একজন স্থানীয় নারী সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেও তদন্তে পাওয়া গেছে।

ওই নারী ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দেওয়ার পর তার স্বামী তাকে মারধর করেছেন বলেও জানা গেছে। পুলিশ কমিশনার বলেন, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা শুনে থাকলে বা দেখে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়া উচিত।


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  রংপুরের চার হত্যা   চাঞ্চল্যকর তথ্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

আইন-আদালত- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close