নারীদের জন্য সব ধরনের সেবা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহজলভ্য, নিরাপদ ও অধিকারভিত্তিক করার লক্ষ্যে ‘প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা প্রাপ্তি’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর দি ডেইলি স্টার ভবনের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে বিদেশি দাতা সংস্থা এফজেএস ও ডিআরএফের অর্থায়নে এবং উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিডিএফ) আয়োজনে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ডব্লিউডিডিএফের চেয়ারপারসন শিরীন আক্তার। সঞ্চালনা করেন ডব্লিউডিডিএফের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডব্লিউডিডিএফের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট কোঅর্ডিনেটর শারমিন আক্তার দোলন।
সেমিনারে আলোচক ছিলেন এবিএফের চেয়ারপারসন মহুয়া পাল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোটের আইনজীবী ব্যারিস্টার আয়েশা আক্তার, আইনজীবী রেজাউল করিম সিদ্দিকী, কনসালটেন্ট ও ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি এক্সপার্ট বাংলাদেশের ভাস্কর ভট্টাচার্যী, সেন্টার ফর ডিজেবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) সহকারী পরিচালক আনিকা রহমান লিপি, ইউএন উইমেন বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রজেক্ট সাপোর্ট অফিসার নাজমা আরা বেগম পপি।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সাবিনা নাসরিন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও।
সেমিনারে মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের রাইট নিয়ে যখন কোনো কমিটি হবে, আলোচনা হবে সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অবশ্যই থাকবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে এ মাসে ৮টি অধিদপ্তরে চিঠি লিখা হয়েছে, আরও লিখা হবে এবং আমরা বসবো।’
তিনি জানান, সারাদেশে সাড়ে ৩৪ লক্ষ প্রতিবন্ধীকে প্রতি মাসে ৯০০ টাকা করে ভাতা দিতাম। এ বছর সরকার বাড়িয়ে ৩৮ লক্ষ প্রতিবন্ধীকে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ আরও বলেন, ‘প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে যে কাজ করা হয়েছে, তা যথেষ্ট নয় সরকারের জবাবদিহিতার জায়গা থেকে এখানে এসেছি। এ কথা সত্যিই যে, এখনও প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি, কিছু ভালো কাজ হয়েছে। কিছু বাকি আছে। এই মাসেই ২০২৬ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় হতে গণপূর্তসহ আটটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্যতা বিষয়টি নিশ্চিতকরণে চিঠি দেওয়া হয়েছে অথচ আইন হয়েছে ২০১৩ সালে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ শুরু করতে হবে, সে মর্মেও মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। এছাড়াও প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য সুস্পষ্টভাবে যে কাজগুলো করা দরকার ধারাবাহিকভাবে নেয়া হবে।’
তিনি স্থপতি ইকবাল হাবিবের প্রস্তাবগুলো উল্লেখ করে বলেন, ‘ইনস্টিটিউট অফ আর্কিটেক্ট বাংলাদেশ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের কাছে চিঠি দেওয়া হবে। আমাদের মন্ত্রণালয় হতে প্রতিবন্ধী ইস্যুতে শক্ত কোঅর্ডিনেশন বাড়ানো হবে, যেন প্রতিবন্ধী পুরুষ ও নারীদের ক্ষমতা নিশ্চিতকরণে জোর দেওয়া যায়। প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়তা আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে মাল্টি সেক্টরাল কাজ করতে হবে।’
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ রেলস্টেশনগুলোর বিষয়ে উল্লেখ করেন সেটি এখনও প্রতিবন্ধী বান্ধব হলো না। তিনি উল্লেখ করেন, সচেতনতা সামাজিক ট্যবু এবং কুসংস্কার আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
‘প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তি নিতে স্কুলগুলো যে অস্বীকৃতি জানায়, এটিকে আইন দিয়ে নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। এখনও পর্যন্ত মানুষ আইনের প্রতি এবং এর বাস্তবায়নের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হচ্ছে না। সুতরাং আমাদের অনেক কাজ করতে হবে, যে কাজগুলো প্রতিবন্ধী-অপপ্রতিবন্ধী মানুষসহ পিছিয়ে পড়া সকল জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী হবে।’
শিরীন আক্তার বলেন, ‘এই সরকার আসার আগে আমরা অনেক দিন হতাশায় ছিলাম যে, আমাদের দাবিগুলো কোথায় জানাবো। এই সরকারের আমলে একটি বাস্তবায়ন কমিটি হয়েছে। আমরা অনেক দিন ধরে চাচ্ছিলাম একটি বাস্তবায়ন কমিটি হোক; যেখানে আমাদের দাবিগুলো জানাতে পারবো। আমরা আশাবাদী যে, এই বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের দাবিগুলোর সমাধান হবে।’
মহুয়া পাল বলেন, ‘আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে কাজ করছি। প্রতি বছর বাজেটের ক্যাম্পেইন করি। বাজেট নিয়ে কাজ করি। আমাদের যে দাবিগুলো আছে তা ঠিকমত পূরণ হয় না।’
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল ও যানবাহন নিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ পর্যন্ত মেট্রোরেল ছাড়া কোনো পরিবহন নেই যেখানে আমরা সহজভাবে নিরাপদে চলাচল করতে পারি।’
অমৃতা রেজিনা রোজারিও বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও কিশোরীরা বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন এবং পিছিয়ে আছেন। এটি অনেকটা চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও আর্থ-সামাজিক নানা দিক থেকে তারা সম্পূর্ণভাবে না হলেও মোটামুটিভাবে বিচ্ছিন্নভাবে আছে। এগুলো নিয়ে যদি আমরা কাজ করলে নিবিড়ভাবে মনোযোগ দেয়া যাবে এবং অ্যাড্রেস করা যাবে।’
‘সমতাভিত্তিক সমাজ। এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় না। এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি অলঙ্ঘনীয় অধিকার। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে প্রতিবন্ধীব্যক্তিদেরকে চ্যারিটি মর্যাদায় না রেখে অধিকারভিত্তিক মর্যাদায় রাখার জোড় দাবি জানিয়ে আসছি।’
সাবিনা নাসরিন বলেন, ‘আমরা সবাই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নানা জায়গায় কাজ করি। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীরা তাদের আন্দোলনের মাধ্যমে নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে। আমি তাদেরকে সেলুট জানাই।’
‘নারীদের জন্য অনেক আইন আছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব আইন বাস্তবায়ন হয় না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে- যথাযথ জবাবদিহিতার অভাব। যার যার দায়িত্ব ঠিকমত পালন করেনা। যার ফলে প্রান্তিক মানুষ সেবা পায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নানা কাজে বিভিন্ন বাজেট হয়। টাকা আসে। এসব টাকা ঠিক জায়গায় খরচ হয় কিনা এগুলো মনিটর করতে হবে।’
ইকবাল হাবিব বলেন, ‘সব জায়গায় সার্বজনীন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ভবন, পার্ক, খেলার মাঠ, রাস্তা ও অন্যান্য জোন পরিকল্পনার নকশায় সার্বজনীন ব্যবহারযোগ্য করা যায় কিনা সেভাবে নকশা করতে হবে। দেশে অসংখ্য ভবন, অসংখ্য নগরায়ন হয়েছে। এসব ভবনে সার্বজনীন ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা আছে কিনা তা অডিট করে দেখতে হবে। প্রতিবন্ধীদের জন্য সার্বজনীন ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।’
শারমিন আক্তার দোলন বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের জন্য নানা আইন আছে; তা শুধু কাগজে কলমে না রেখে বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে।’
‘প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা বা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এগুলো তাদের এটি অধিকার। আমরা এমন একটি সমাজ চাই যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষ কোনো করুণা বা বোঝা হিসেবে নয় বরং তারা অধিকার সম্পন্ন একজন নাগরিক এবং সমাজে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইন, নীতি, বাজেটের পাশাপাশি তাদের যে নিজেদের কণ্ঠ আছে সেটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আনতে হবে।’
নাজমা আরা বেগম পপি বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে আইনের অভাব নাই। তারপরও প্রতিবন্ধী নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আমরা তাদেরকে সুরক্ষা দিতে পারি না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের অনেক মামলায় গিয়েছি। আমি দেখেছি আমাদের প্রতিবন্ধী অধিকার সুরক্ষা আইন ২০১৩-এ অনেক কিছু স্পষ্ট নাই।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত প্রতিবন্ধী নারী আনিলা বলেন, ‘বার এক্সাম পরীক্ষায় টাইমিংয়ে অতিরিক্তি ২০ মিনিট সময় থেকে আরও টাইম বাড়িয়ে দিতে হবে।’
আনিলা জানান, তিনি নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য যে অধিকার আইন আছে তার ওপর একটি কমপ্লেটিভ স্টাডি করছেন। সেখানে নেপাল আমাদের পরে যে প্রতিবন্ধী নারীদের যে আইন করেছে সেটি সেখানে স্পষ্ট করে আছে। আর বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নারীর আইনে স্পষ্ট নেই।
এটি রিভিউ করা দরকার বলে আনিলা জানান।
প্রতিবন্ধী নারী অনামিকা বলেন, ‘করোনার পর থেকে প্রতিবন্ধী নারীরা গ্রামে কি যে কষ্টে আছেন- আপনারা সরেজমিনে না গেলে বুঝবেন না। আমি দিনাজপুরের উত্তরাঞ্চলের গ্রামে কাজ করি। এখন প্রতিবন্ধী নারীরা শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন। কিন্তু কর্মসংস্থানের অবস্থা খুবই কম। তারা অনাহারে জীবনযাবন করছেন।’
তিনি প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
সেমিনারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ প্রায় ৭০ জন অতিথি অংশ নেন।
সেমিনারে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য বিদ্যমান সেবা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি ও প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
কেকে/এমএ