রিজিক আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য একটি বড় নেয়ামত। মানুষের জীবনযাত্রা, প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা দুশ্চিন্তার মধ্যেও রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
মানবজীবন সবসময় একই গতিতে চলে না। কখনো স্বস্তি আসে, আবার কখনো কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়। জীবনের কোনো পর্যায়ে মনে হতে পারে, সব পথ যেন বন্ধ হয়ে গেছে। তখন মানুষ আল্লাহর রহমত ও সাহায্যের আশায় তাঁর দিকে ফিরে যায়।
ইসলাম মানুষকে শুধু দোয়া করার শিক্ষা দেয়নি; বরং হালাল পথে পরিশ্রম করে জীবিকা অন্বেষণের পাশাপাশি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার নির্দেশ দিয়েছে। রিজিকে বরকত ও প্রশস্ততার জন্য নিয়মিত ইবাদত, দোয়া, ইস্তিগফার এবং সৎকাজের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
হালাল পথে রিজিক অন্বেষণ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
فَاِذَا قُضِیَتِ الصَّلٰوۃُ فَانۡتَشِرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ وَ ابۡتَغُوۡا مِنۡ فَضۡلِ اللّٰهِ وَ اذۡکُرُوا اللّٰهَ کَثِیۡرًا لَّعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ
অর্থ: “অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো। আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”
—সুরা আল-জুমুআহ, আয়াত ১০
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইবাদতের পাশাপাশি বৈধ ও হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।
ইবাদতে মনোযোগ
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আদম সন্তান, তুমি আমার ইবাদতের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করো; আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্যে পূর্ণ করে দেব এবং তোমার অভাব দূর করে দেব। আর তুমি যদি তা না করো, তাহলে তোমার হাত ব্যস্ততায় পূর্ণ করে দেব এবং তোমার অভাব দূর করব না।
এই বর্ণনাটি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং সুনানে তিরমিজিতে এসেছে।
হাদিসটির শিক্ষা হলো—দুনিয়াবি ব্যস্ততার পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদতের জন্য সময় বের করা জরুরি। জীবনের প্রয়োজন পূরণে চেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব।
রিজিকে বরকতের জন্য দোয়া
রিজিক ও জীবনে বরকতের জন্য একটি দোয়া রয়েছে—
اللهم اغفر لي ذنبي ووسع لي في رزقي وبارك لي فيما رزقتني
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লি জাম্বি, ওয়া ওয়াসসি‘ লি ফি রিযকি, ওয়া বারিক লি ফিমা রাজাকতানি।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমার গুনাহ ক্ষমা করুন, আমার রিজিক প্রশস্ত করে দিন এবং আপনি আমাকে যে রিজিক দিয়েছেন, তাতে বরকত দান করুন।
সুনানে তিরমিজিতে এ দোয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়। আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন, অভাব ও রিজিকের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল।
বেশি বেশি ইস্তিগফার
রিজিক ও কল্যাণের জন্য ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার প্রতিও কোরআনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সুরা নুহে হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। এরপর বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তাঁর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করা মুমিনের জন্য কল্যাণের পথ খুলে দিতে পারে।
সূরা আল-ওয়াকিয়া তিলাওয়াত
অনেক মুসলমান রিজিকে বরকতের আশায় নিয়মিত সূরা আল-ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করেন। তবে ‘প্রতিদিন রাতে সূরা ওয়াকিয়া পড়লে কখনো দারিদ্র্য আসবে না’—এ মর্মে যে বর্ণনাটি প্রচলিত, তার সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই এটিকে নিশ্চিত বা অকাট্য হাদিস হিসেবে প্রচার না করাই সতর্কতার বিষয়।
তবে কোরআনের প্রতিটি সূরা তিলাওয়াতই সওয়াবের আমল। তাই সূরা আল-ওয়াকিয়াসহ কোরআন নিয়মিত পড়া, অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা একজন মুসলমানের জন্য কল্যাণকর।
তাওয়াক্কুলের সঙ্গে পরিশ্রম
শুধু দোয়া করলেই হবে না, রিজিকের জন্য হালাল পথে চেষ্টা করাও জরুরি। একজন মানুষ তার সাধ্য অনুযায়ী কাজ করবে, পরিশ্রম করবে এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে।
হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদ যত বেশি হোক, তাতে প্রকৃত বরকত থাকে না। তাই রিজিকের ক্ষেত্রে পরিমাণের পাশাপাশি তার উৎস হালাল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
রিজিক শুধু অর্থ-সম্পদের নাম নয়। সুস্থতা, পরিবার, নিরাপত্তা, জ্ঞান, সময়, শান্তি—সবই আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত। তাই জীবনে অভাব বা সংকট এলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করা, দোয়া করা এবং বৈধ পথে নিজের দায়িত্ব পালন করা উচিত।
মানুষের কাজ হলো চেষ্টা করা; আর ফলাফল আল্লাহর হাতে। তাই রিজিকের জন্য দোয়ার পাশাপাশি হালাল উপায়ে পরিশ্রম, ইবাদত, ইস্তিগফার ও সৎকাজকে জীবনের অংশ করে নেওয়াই হতে পারে একজন মুমিনের সুন্দর পথ।
কেকে/সাশ