বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: বিগত সরকারের প্রকল্পের দুর্নীতির তদন্ত হচ্ছে, রিপোর্ট পেলে ব্যবস্থা : প্রধানমন্ত্রী      ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে : রাষ্ট্রপতি      ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলবে ইলেকট্রিক ট্রেন : প্রধানমন্ত্রী      রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী পদের আগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা      সেপ্টেম্বরের শেষে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ হতে পারে : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী      পলিথিন-প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      সিঙ্গাপুরে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পত্তি ক্রোক      
দেশজুড়ে
অবহেলায় পড়ে আছে ১৩০ কোটি টাকার চিলাহাটি স্টেশন
মোশাররফ হোসেন, নীলফামারী
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪১ পিএম
ছবি: প্রতিবেদক

ছবি: প্রতিবেদক

উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি। সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ী। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথটি ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর ২০২১ সালের ১ আগস্ট আবারও চালু হয় এ রেলপথ। এরপর শুরু হয় পণ্য পরিবহন। পরের বছর চালু হয় ঢাকা-শিলিগুড়ি রুটের যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মিতালি এক্সপ্রেস’।

চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনে মিতালি এক্সপ্রেসে ভারত যাওয়ার জন্য কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কাজ সম্পন্ন করতে হতো ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন আইকনিক স্টেশন ভবন। তবে স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভবনটি এখন তালাবদ্ধ। পড়ে আছে ব্যবহারহীন অবস্থায়।

২০২৫ সালের আগস্টে অবকাঠামো না থাকার কারণ দেখিয়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চিলাহাটি স্থলবন্দর বন্ধ ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় সীমান্ত বাণিজ্যের কার্যক্রম। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত আইকনিক ভবনসহ রেলপথের বিভিন্ন অবকাঠামো এখন অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আইকনিক ভবনের একতলার বারান্দায় সারি সারি ফ্যান। দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো আর ঘোরে না। জানালা দিয়ে দেখা যায়, ঘরের ভেতরে প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল ও স্টিলের টুল পড়ে আছে। ধুলায় বিবর্ণ হয়ে গেছে সেগুলো। দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত কক্ষগুলোও খালি।

তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁর জন্য রাখা জায়গাটিও ফাঁকা পড়ে আছে। ভবনের পাশে থাকা দোতলা ভিআইপি অতিথিশালাটিও তালাবদ্ধ। একইভাবে অব্যবহৃত পড়ে আছে ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি ও গার্ডরুম। সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত রেললাইনের অনেক
জায়গায়ও পড়েছে মরিচা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পণ্য পরিবহন চালু থাকাকালে চিলাহাটিকে ঘিরে শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ছিল। এতে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। বেড়েছিল আশপাশের জমির দামও। বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসার সম্ভাবনা দেখে অনেকে বিনিয়োগের পরিকল্পনাও করেছিলেন। কিন্তু বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা অনেকটাই থেমে গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘চিলাহাটি দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ অন্যান্য বন্দরের তুলনায় কম ছিল। এখন বুড়িমারী ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এসব বন্দর তুলনামূলক দূরে হওয়ায় পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে।’

ভারতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাসুদেব রায় বলেন, ‘মিতালি এক্সপ্রেস চালুর পরও চিলাহাটিতে ইমিগ্রেশন সুবিধা না থাকায় ঢাকায় গিয়ে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কাজ করতে হতো। পরে চিলাহাটিতে ইমিগ্রেশন সুবিধার জন্য এ আইকনিক ভবন নির্মাণ করা হয়। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারের বিপুল অর্থের বিনিয়োগ এখন কাজে আসছে না।’

স্থানীয় বাসিন্দা কাজল ইসলাম বলেন, ‘বন্দর চালু থাকায় এলাকার দরিদ্র মানুষের কিছু কর্মসংস্থান হয়েছিল। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর অনেকেই কাজ হারিয়েছেন। স্থলবন্দরটি দ্রুত চালু করা হলে স্থানীয় মানুষের উপকার হবে।’

নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মো. আবদুল ওয়াহেদ সরকার বলেন, ‘চিলাহাটি দিয়ে তুলনামূলক কম খরচে পাথর সৈয়দপুর পর্যন্ত আনা যেত। এখন পঞ্চগড় ও লালমনিরহাট হয়ে ট্রাকে পাথর আনতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়েছে। বন্দর বন্ধ হওয়ায় সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সরকার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বার্থে এটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।’

শুধু আইকনিক ভবন নির্মাণেই নয়, চিলাহাটি ও চিলাহাটি বর্ডার রেলপথ নির্মাণেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের চিলাহাটি ও চিলাহাটি বর্ডার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. আবদুর রহিম বলেন, ‘রেলপথ নির্মাণে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০ কোটি টাকা। পরে ব্যয় বেড়ে ১২৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪ সালের জুনে কাজ শেষ হয়। রেলের ওয়াগন, সড়ক, বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক খাত মিলিয়ে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।’

এদিকে স্থলবন্দর বন্ধ হওয়ায় রাজস্ব হারাচ্ছে রেলওয়েও। চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, পাথরবাহী একেকটি ট্রেনের চালান থেকে পাথরের পরিমাণ অনুযায়ী রেলওয়ে ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া পেত। মাসে চার-পাঁচটি মালবাহী ট্রেন চলাচল করায় মাসিক আয় দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা।

চিলাহাটি স্টেশনের সহকারী মাস্টার ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘২০২১ সাল থেকে ভারত থেকে মূলত পাথরবোঝাই ট্রেন আসত। মাসে চার থেকে পাঁচটি মালবাহী ট্রেন চলাচল করত। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেলওয়ের প্রায় ১৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী দুই ধরনের ট্রেনের চলাচলই বন্ধ হয়ে যায়।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, ‘চিলাহাটি স্থলবন্দরের সম্ভাবনার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। আশা করছি, ভবিষ্যতে বন্দরটি আবার চালু হবে।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের দাবি, চিলাহাটি স্থলবন্দর পুনরায় চালু হলে শুধু নীলফামারী নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে। একই সঙ্গে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। 

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  অবহেলা   চিলাহাটি স্টেশন   নীলফামারী  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close