একসময় আগাছায় ঢাকা পড়ে ছিল জমিটি। চা চাষের উপযোগিতা হারানোয় বছরের পর বছর পড়ে ছিল অনাবাদি। সেই পতিত জমিতেই এখন সারি সারি ড্রাগনগাছ। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে রক্তিম লাল ও গোলাপি ফল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে লাল রঙের অসংখ্য প্রদীপ।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সিরাজনগর চা বাগানের এ দৃশ্য এখন কেবল চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যের নয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও। প্রায় এক হেক্টর চা চাষের অনুপযোগী জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক ড্রাগন ফলের বাগান। প্রায় ১৪ হাজার গাছের এ বাগানে ফলছে থাই রেড, জাম্বো রেড ও হোয়াইট পিংক জাতের ড্রাগন।
২০২৪ সালে প্রায় ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে দ্বিতীয় বছর থেকেই ফলন আসতে শুরু করেছে। চলতি মৌসুমেই প্রায় ১২ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়ে গেছে। মৌসুম শেষে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছে বাগান কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, সিরাজনগর চা বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে চায়ের চিরচেনা সবুজ। তবে সেই সবুজের মাঝেই যেন আলাদা গল্প লিখেছে ড্রাগন বাগান। সারি সারি খুঁটির ওপর বেড়ে উঠেছে ড্রাগনগাছ। কোনো গাছে ফুল, কোনো গাছে কাঁচা ফল, আবার কোনো গাছে পেকে ঝুলছে রক্তিম লাল ড্রাগন। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফলের সমারোহে পুরো বাগানজুড়ে তৈরি হয়েছে নান্দনিক দৃশ্য।
ভোরের আলো কিংবা বিকেলের নরম রোদে বাগানটির সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। আর সেই সৌন্দর্যের আড়ালেই চলছে পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদন।
বাগান কর্তৃপক্ষ জানায়, চা চাষের অনুপযোগী জমি ফেলে না রেখে বিকল্প কৃষির আওতায় আনার চিন্তা থেকেই ড্রাগন চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৪ সালে প্রায় ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শুরু হয় প্রকল্পটি। প্রথম বছর গাছের পরিচর্যা ও বেড়ে ওঠার পর দ্বিতীয় বছর থেকেই ফলন পাওয়া শুরু হয়। এখন ধীরে ধীরে বাড়ছে উৎপাদন।
চলতি মৌসুমে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি হয়েছে। বাগান কর্তৃপক্ষের আশা, মৌসুম শেষ হলে বিক্রির পরিমাণ আরও বাড়বে।
এ বাগানের আরেকটি বড় সাফল্য শুধু আয় নয়—এটি বদলে দিয়েছে চা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগও। চা বাগানের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ড্রাগন বাগানে কাজ করছেন শ্রমিকরা। গাছের পরিচর্যা, ফুলের যত্ন, আগাছা পরিষ্কার ও ফল সংগ্রহ—বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন তারা। এতে তৈরি হয়েছে বাড়তি কাজ ও আয়ের সুযোগ।
শুধু তাই নয়, বাগানে উৎপাদিত ড্রাগন ফল শ্রমিকদের বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। ফলে যে ফল অনেক শ্রমিক পরিবারের নিয়মিত বাজার থেকে কেনা সম্ভব নয়, সেটিই এখন তারা কর্মস্থল থেকে ঘরে নিয়ে যেতে পারছেন।
চা শ্রমিক জোসনা পাশি বলেন, ‘ভালো মানের ড্রাগন ফল এখন বাগান থেকেই বিনামূল্যে নিতে পারছি। এতে পরিবারের সবাই ফল খাচ্ছেন। যেমন আনন্দ লাগছে, তেমনি পুষ্টিরও জোগান হচ্ছে।’
চা শ্রমিক কাঞ্চন বাউড়ি বলেন, ‘এখানে কাজ করে নিয়মিত আয় হচ্ছে। চা বাগানের পাশাপাশি বাড়তি কাজের সুযোগও মিলছে।’
বাগানের শ্রমিকরা জানান, ড্রাগন গাছে ফুল আসার প্রায় ২৫ থেকে ২৬ দিনের মধ্যেই ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। ফলে একই জমিতে পর্যায়ক্রমে ফল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
ড্রাগন প্রকল্পের ম্যানেজার খান মো. আল মিকাত বলেন, ‘চা চাষের অনুপযোগী পরিত্যক্ত জায়গা ব্যবহার করতেই আমরা এ ড্রাগন প্রজেক্টটি শুরু করি। এক বছর পর থেকেই ফল আসতে শুরু করে। এখন ধীরে ধীরে ফসল উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। নান্দনিক এ বাগানে রয়েছে টাটকা ও সুস্বাদু ড্রাগন। তাই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে এ ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাগানের এই সাফল্য দেখে কুলাউড়া ও আশপাশের এলাকার অনেক তরুণ উদ্যোক্তাও বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে চা-নির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি পতিত জমিতে বিকল্প ফল চাষের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।’
সিরাজনগর চা বাগানের ম্যানেজার শামীম ইসলাম বলেন, ‘চা প্লান্টেশনের বাইরে থাকা পতিত ভূমিতে বাগানের শ্রীবৃদ্ধির জন্য ড্রগন বাগান তৈরি করা হয়েছিল। এখন এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’
তিনি জানান, বাগানে কোনো ধরনের কীটনাশক বা ক্ষতিকর পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হয় না। জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় ফল নিরাপদ ও মানসম্মত।
কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ‘চা চাষের অনুপযোগী পতিত জমি এখন আর পড়ে থাকছে না, এসব জমিকে পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের আওতায় এনে গড়ে উঠছে ড্রাগন ফলের বাগান। এতে চা বাগানগুলোতে বাড়তি আয়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি উৎপাদিত ড্রাগন ফল শ্রমিকদের পুষ্টির চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চা বাগানের পতিত জমিতে ড্রাগন চাষ তাই শুধু বিকল্প কৃষি উদ্যোগ নয়, বরং আয়বর্ধক ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার সম্ভাবনাময় এক নতুন দৃষ্টান্ত।’
কেকে/এআই