মাঠে বীজ বুনে ভালো ফলনের আশায় ছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু ধানগাছ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার আগেই ছড়া চলে আসায় এখন দিশেহারা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত কৃষক। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সোনালী সিড কোম্পানি লিমিটেডের ‘রঞ্জিত পাইজাম’ জাতের বীজধান কিনে ৪৫ থেকে ৫০ কানি জমিতে চাষ করার পর এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, ধান রোপণের মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই গাছে ছড়া দেখা দিয়েছে। এ সময় পর্যন্ত ধানের গোছা স্বাভাবিকভাবে বড় হয়নি। অনেক গাছের পাতা ও কাণ্ড লালচে হয়ে গেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলন তো দূরের কথা, শেষ পর্যন্ত খড়ও পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বাইশারী ইউনিয়নের যৌথখামার এলাকার বিভিন্ন ধানখেত এবং পাশের কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া বড়বিল এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ‘রঞ্জিত পাইজাম’ জাতের ধান চাষ করা কয়েকটি জমিতে অস্বাভাবিকভাবে ছোট অবস্থায়ই গাছে ছড়া এসেছে। অনেক গাছের গোছা স্বাভাবিক আকার ধারণ করেনি। কোথাও কোথাও গাছের পাতা ও কাণ্ডে লালচে ভাব দেখা গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে মো. আনিসুর রহমান, অলি আহমদ, আকবর আহমদ, আব্দুল জব্বার, আবু তাহের, মো. ইউসুফ, মোতালেব, ওবায়দুর রহমান, মো. হেলাল উদ্দিন, আব্দুল হাকিম ও হামিদুল হকসহ প্রায় অর্ধশত কৃষক রয়েছেন।
কৃষকেরা জানান, বাইশারীর ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বান্ডুর দোকান থেকে উন্নত ও উফশী জাতের বীজধান হিসেবে ‘রঞ্জিত পাইজাম’ কিনে জমিতে রোপণ করেন তারা। বীজ বিক্রির সময় যে পদ্ধতিতে চাষাবাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, সেই অনুযায়ী জমি প্রস্তুত, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ধানগাছ বড় হওয়ার আগেই ছড়া চলে আসায় এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
কৃষক মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘উন্নত জাতের বীজ মনে করেই টাকা দিয়ে বীজ কিনেছি। ধারদেনা করে জমিতে চাষ করেছি। কিন্তু ধানগাছ বড় হওয়ার আগেই ছড়া চলে এসেছে। এখন ফলন পাব কি না জানি না। আমাদের সব টাকা-পয়সা পানিতে গেছে।’
মো. অলি আহমদ ও মো. আব্দুল জব্বারসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, প্রতি কানি জমিতে তাদের প্রায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বীজ, জমি প্রস্তুত, শ্রমিক, সার ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন খাতে এ অর্থ ব্যয় করেছেন তারা। ফলন না হলে ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন।
তাদের ভাষায়, ‘আমরা কৃষক। ধার করে চাষ করি, ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করি এবং সংসার চালাই। এবার যদি ধানই না হয়, তাহলে আমাদের পরিবার চলবে কীভাবে?’
কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে বাইশারীর ব্যবসায়ী আব্দুল করিম বান্ডু বলেন, তিনি কৃষকদের কাছে ‘রঞ্জিত পাইজাম’ ধানের বীজের প্যাকেট বিক্রি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘বেশির ভাগ কৃষকের ধান ভালো হয়েছে বলে আমি জেনেছি। তবে মুষ্টিমেয় কয়েকজন কৃষকের ধান খারাপ হয়েছে বলে শুনেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি। কোম্পানির প্রতিনিধি এসে সরেজমিনে জমি দেখেও গেছেন। তারা কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে সোনালী সিড কোম্পানির প্রতিনিধি মো. শোয়াইব বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি। কৃষকেরা আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী চাষ করেননি বলেই এ ধরনের সমস্যা হয়েছে। যারা আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী চাষ করেছেন, তাদের ধান এখন পর্যন্ত ভালো আছে।’
তিনি দাবি করেন, কোম্পানির পক্ষ থেকে কৃষকদের বিভিন্ন সার, কীটনাশক ও উন্নতমানের স্প্রে ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি অংশ সেসব পরামর্শ মানছেন না।
মো. শোয়াইব বলেন, ‘তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য আমাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে আমরা বিষয়টি দেখছি।’
তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, তারা বীজ বিক্রেতা ও কোম্পানির দেওয়া নির্দেশনা মেনেই চাষাবাদ করেছেন। এরপরও রোপণের কয়েক দিনের মধ্যে ধানগাছে ছড়া আসায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
সোনালী সিড কোম্পানি লিমিটেডের মালিকের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাইশারী ব্লকের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। সেই অনুযায়ী তাদের কাজ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখতে হবে।’
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইনামুল হক বলেন, ‘রঞ্জিত পাইজাম নামে যে বীজধানের কথা বলা হচ্ছে, এ নাম আমি আগে শুনিনি। ওই বীজধানের চাষ ভালো হয়নি বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এবং বিষয়টি নজরদারিতে রাখতে বলেছি। পাশাপাশি বীজধানের প্রতিনিধিকেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে।’
কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে বীজের গুণগত মান পরীক্ষা ও কৃষি বিভাগের কারিগরি যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ কৃষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, নিম্নমানের বা অনুপযোগী বীজের কারণে তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে কোম্পানির প্রতিনিধি দাবি করছেন, কৃষকেরা কোম্পানির পরামর্শ অনুযায়ী চাষ না করায় এ সমস্যা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে ধানগাছ অস্বাভাবিকভাবে ছড়া আসার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক।
কেকে/সাশ