আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতায় গরুর খামার গড়ে নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তৌহিদুল আলম তুষার। গরু পালন, দুধ, মাঠা ও ঘি বিক্রির মাধ্যমে শুধু আর্থিকভাবেই স্বাবলম্বী হননি, নিজের এলাকায় একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি অনুকরণীয় দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন। তার এ উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক পশুপালনে আগ্রহ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০০৫ সালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার জুনিয়াদহ ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামে মাত্র একটি বকনা দিয়ে শুরু করে বর্তমানে বড় পরিসরের গরুর খামার গড়ে তুলেছেন তিনি। এখন তিনি ‘তৌফিক ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্ট’-এর মালিক। ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে তার খামারে ১৫টি গাভী রয়েছে।
জুনিয়াদহ তহশিল অফিসের পেছনে নিজের জমিতে গড়ে তুলেছেন এই খামার। টিনশেডের বড় শেডে ফ্রিজিয়ান জাতের গরু পালন করছেন তিনি। খামারের দেখভালের জন্য সেখানে কয়েকজন বেতনভুক্ত শ্রমিক কাজ করছেন।
খামারের পাশে রয়েছে ঘাস চাষের ব্যবস্থা। খড়, ভুসি ও খৈলসহ সুষম খাদ্য দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে গরুগুলো মোটাতাজা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা। পাশাপাশি আরও একটি নতুন শেড তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে নিজস্ব খামারের গাভীর উৎপাদিত দুধ দিয়ে দই উৎপাদন করবেন তিনি।
তুষারের খামারে বর্তমানে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। কোনো কোনো সময় তা ১৫০ লিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। দুধ সংগ্রহ, দুধ থেকে ক্রিম আলাদা করা ও মাঠা তৈরির কাজ স্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ মেশিনের মাধ্যমে করেন তিনি। দুধ সংগ্রহের সময় নিজে উপস্থিত থেকে সবকিছু তদারক করেন তুষার। তার চারজন কর্মচারীও রয়েছেন। তাঁদের ২০ হাজার টাকা বেতনসহ সব মিলিয়ে প্রতি মাসে তাঁর খরচ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
খামারি তৌহিদুল আলম তুষার জানান, ‘দুধ বিক্রি করি ১০০ টাকা লিটার। এখন দুধ বিক্রি করি কম। কারিগর রেখেছি। এখন আমার ফার্মের দুধ দিয়ে মাঠা তৈরি করে ভেড়ামারার বাজারগুলোতে ভ্যানে করে মাঠা বিক্রি করি। মাঠা বিক্রির জন্য দুটি গাড়ি বানিয়েছি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে। এতে আরও দুজন মানুষের কর্মসংস্থান করেছি আমি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন ফজরের নামাজের সময় থেকে মাঠা বিক্রি শুরু করি। সকাল থেকে গাড়িতে করে আমার বিকিকিনি চলে। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৮০ লিটার পর্যন্ত মাঠা বিক্রি করতে পারি। শুক্রবার হলে আরও বেশি বিক্রি হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন আমার বাড়িতেও মাঠা খেতে আসে। প্রতি গ্লাস ২০ টাকা ও লিটার ১৪০ টাকা বিক্রি করি। এতে করে আমার প্রতিদিন আয় হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।’
তার এই উদ্যোগ শুধু নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, এলাকায় কয়েকজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে।
মাঠা নিতে আসা লিটন বলেন, ‘আমার ফ্যামিলির সবাই এই মাঠা খুব পছন্দ করে। তাই এখানে মাঠা নিতে আসছি।’
ভেড়ামারা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তারিক হাসান জানান, ‘আমরা উদ্যোক্তাদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও খামার পরিচালনার বিষয়ে সহযোগিতা দিয়ে থাকি। তৌহিদুল আলম তুষারের মতো উদ্যোক্তারা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা। তার দেখাদেখি আরও অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে পশুপালনে আগ্রহী হবেন বলে আমরা আশা করছি।’
ছোট পরিসর থেকে শুরু করে তুষার এখন একজন সফল খামারি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তার খামার এখন উপজেলার বড় ও সফল খামারগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সব মিলিয়ে তুষারের এই গরুর খামার এখন ভেড়ামারার সফল উদ্যোক্তার একটি উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
কেকে/এমএস