এক সময় যে জমিতে বছরে একবার ধান চাষ হতো, বছরের বাকি সময় থাকত পতিত। সেই জমিতেই এখন সারি সারি হলুদ তরমুজ। মাটির ওপর বিছিয়ে থাকা সবুজ লতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে হলুদ রঙের বাহারি ফল। ব্যতিক্রমী এ তরমুজবাগান দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ কিনে নিচ্ছেন পরিবারের জন্য। এ পরিবর্তনের নেপথ্যে জুড়ী উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলম।
প্রায় পাঁচ বছর আগে ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষের ভিডিও দেখেই তার মনে হয়–একবার চেষ্টা করে দেখা যাক। সেই চেষ্টা শুরু হয়েছিল মাত্র ছয় শতাংশ জমিতে। পরীক্ষামূলক চাষে সাফল্য পাওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন প্রায় তিন বিঘা জমিতে চাষ করছেন বিভিন্ন জাতের হলুদ তরমুজ। চলতি মৌসুমে তার প্রত্যাশা ৮-৯ লাখ টাকার ফল বিক্রি হবে। খরচ বাদে সম্ভাব্য মুনাফা প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের ডোমাবাড়ি গ্রামের খোর্শেদ আলম পেশায় পরিবেশ ও সংবাদকর্মী। কৃষিতে তার আনুষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ছিল না বললেই চলে। ইউটিউবের ভিডিও দেখেই শুরু হয়েছিল আগ্রহ। ২০২২ সালে পরিবারের চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে ছয় শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে হলুদ তরমুজ চাষ করেন। ফলন ভালো হওয়া এবং বাজারে চাহিদা থাকায় শখের সেই চাষই পরে পরিণত হয় বাণিজ্যিক উদ্যোগে।
খোর্শেদ আলম বলেন, ‘ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষ দেখে শখ জাগে। ভাবলাম একবার পরীক্ষা করে দেখি। ছয় শতাংশ জমিতে বীজ বপন করলাম। ফলন ভালো হওয়ার পর দেখলাম এর চাহিদাও বেশ। তখন থেকেই বাণিজ্যিকভাবে চাষের চিন্তা করি।’
তার সেই ছোট্ট পরীক্ষাই এখন রূপ নিয়েছে বড় উদ্যোগে। চলতি মৌসুমে নিজের প্রায় তিন বিঘা জমিতে ল্যানফাই, সূর্যডিম, সানগোল্ড, লিয়োনা, রবি, সাম্মাম মার্লিন ও হ্যানিডিউ মেলন জাতের তরমুজ চাষ করেছেন খোর্শেদ। এর মধ্যে ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজই বেশি নজর কেড়েছে দর্শনার্থীদের।
গত বছরের ১৮ নভেম্বর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জুড়ীর সহযোগিতায় ডোমাবাড়ি কচুরগুল ব্লকের ৩৩ শতাংশ জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এ চাষ শুরু করেন তিনি।
খোর্শেদের তরমুজ বাগান এখন শুধু আয়ের উৎস নয়, স্থানীয়দের কাছেও এক ধরনের আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা।
বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি দেখে লোভ সামলাতে পারিনি। তরুণ বয়সে খোর্শেদের এমন উদ্যোগ সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।’
বাগানে আসা অনেকের কাছেই হলুদ তরমুজ দেখা কিংবা খাওয়ার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম। কেউ শুধু বাগান ঘুরে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ পছন্দের তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকজন ক্রেতা একসঙ্গে ৪-১৫টি পর্যন্ত তরমুজও কিনছেন।
উদ্যোক্তা খোর্শেদ জানান, হলুদ তরমুজ শীত মৌসুমের ফসল। চাষের প্রায় তিন মাসের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। চলতি মৌসুমে তার প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ও বাজারদর ভালো থাকলে আট থেকে নয় লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন তিনি। গত মৌসুমের অভিজ্ঞতা আরও আশাবাদী করেছে তাকে। প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে তরমুজ চাষ করে প্রায় আট লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছিলেন। অর্থাৎ তিন মাসের ফসল থেকে খরচ বাদে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় হয়েছিল।
খোর্শেদ বলেন, ‘জুড়ীর আবহাওয়া হলুদ তরমুজ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। মাত্র তিন মাসে ফলন পাওয়া যায়। আমি মনে করি, এ এলাকায় আরও বড় পরিসরে চাষের সুযোগ রয়েছে।’
নিজের সাফল্যের পাশাপাশি এলাকার পতিত জমিকে কৃষির আওতায় আনার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন খোর্শেদ। তার ভাষ্য, জুড়ীতে এখনো বিভিন্ন কারণে হাজার হাজার বিঘা জমি বছরের বড় একটি সময় পতিত পড়ে থাকে। এসব জমিতে স্বল্পমেয়াদি ও লাভজনক ফসল আবাদ করা গেলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘জুড়ীতে অনেক জমি পতিত পড়ে আছে। শিক্ষিত বেকার যুবকেরা চাইলে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন। একটু সাহস করে শুরু করলে কৃষি থেকেই স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।’
স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে খোর্শেদ বলেন, ‘আগামী বছর আরও জমিতে চাষ বাড়াব। পাশাপাশি অন্য নতুন ফসলও যুক্ত করতে চাই। আমার লক্ষ্য জুড়ীকে কৃষিসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা।’
জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, ‘ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ চাষ জুড়ী উপজেলায় ইতেমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। খোর্শেদের উদ্যোগ ইতেমধ্যে আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। তার বাগান দেখে অনেকেই হলুদ তরমুজ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় পরিচিতিও বাড়ছে দ্রুত। প্রতিদিন শত শত কৃষক ও দর্শনার্থী বাগানটি দেখতে আসছেন।’
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ একটি উচ্চমূল্যের হাইব্রিড জাত। উৎপাদন পদ্ধতি অনেকটা দেশি তরমুজের মতো। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এ ও সি রয়েছে এবং ফলটি বেশ মিষ্টি। জুড়ীর মাটি ও আবহাওয়া এ জাতের তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী।’
কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের সহযোগিতাকে এ উদ্যোগের অন্যতম সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করে মাহমুদুল আলম বলেন, ‘কেউ আগ্রহী হলে কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা প্রদান করা হবে।’
কেকে/এআই