খাল-বিল, ডোবা আর জলাশয়ে একসময় কচুরিপানা ছিল কৃষকের কাছে নিছক আগাছা। জলাশয় পরিষ্কার করতে গিয়ে তুলে ফেলে দেওয়া হতো। সেই কচুরিপানাই এখন কিশোরগঞ্জের অনেক কৃষক ও খামারির কাছে হয়ে উঠেছে গবাদিপশুর খাবারের অন্যতম ভরসা। সকাল হলেই হাতে দা নিয়ে জলাশয়ে নেমে পড়ছেন তারা। কেউ ভ্যানে, কেউ রিকশায়, আবার কেউ মাথায় করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন কচুরিপানা।
এর পেছনে রয়েছে চলতি বছরের ফসলহানি। টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসল। ফলে কমেছে খড়ের জোগান। অন্যদিকে বেড়েছে ভুসি, দানাদার খাবার ও রেডি ফিডের দাম। এতে গবাদিপশু পালন করতে গিয়ে বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা। তাই বিনা খরচে বা কম খরচে পাওয়া কচুরিপানাকেই বিকল্প খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন অনেকে।
বিশেষ করে গাভি ও গরুর খাবারের জোগান ঠিক রাখতে বাড়ির আশপাশের কলাগাছ কেটে ছোট ছোট টুকরো করেও খাওয়াচ্ছেন কৃষকেরা। কচুরিপানা ও কলাগাছের সঙ্গে খড়, ঘাস, ভুসি কিংবা অন্যান্য খাবার মিশিয়ে গবাদিপশুকে দেওয়া হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গবাদিপশু পালন বহু পরিবারের বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস। কেউ দুধ বিক্রি করে সংসারের খরচ চালান, কেউ গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করেন। আবার অনেকের কাছে গবাদিপশু সঞ্চয়ের বিকল্প। প্রয়োজনের সময় গরু বিক্রি করে সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিয়ে কিংবা অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় মেটান তারা। ফলে গবাদিপশুর খাদ্যসংকট শুধু খামারেই নয়, এর প্রভাব পড়ে কৃষকের পারিবারিক অর্থনীতিতেও।
জেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খড় প্রতি কেজি প্রায় ২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি মণ খড়ের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার টাকা। ৩৭ কেজির এক বস্তা গমের ভুসি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬৩০ টাকা এবং ৪০ কেজির এক বস্তা ভুট্টার গুঁড়া ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে।
এর সঙ্গে রয়েছে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ। অন্যদিকে পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাসও মিলছে না। অল্প কিছু উঁচু জমি, রাস্তার পাশ কিংবা বসতবাড়ির আশপাশে ঘাস পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোও কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষক ও ছোট খামারিরা।
খামারিরা বলছেন, গরুর খাবারের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় গরু বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে বাড়ছে খাবারের খরচ, অন্যদিকে কম দামে গরু বিক্রি করলে লোকসানের আশঙ্কা থাকছে। তাই গরু বিক্রি না করে কোনোভাবে লালন-পালন চালিয়ে যেতে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য বিকল্প খাবারের ওপর নির্ভর করছেন তারা।
জেলার কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, খাল-বিল, ডোবা ও জলাশয় থেকে কচুরিপানা সংগ্রহে ব্যস্ত কৃষক ও খামারিরা। কেউ বাড়ির পাশের জলাশয় থেকেই কচুরিপানা তুলে আনছেন। আবার কেউ কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা কিংবা অন্য কোনো যানবাহনে করে তা সংগ্রহ করছেন। কোনো কোনো খামারি শ্রমিক নিয়োগ করেও কচুরিপানা সংগ্রহ করছেন।
সকালে জলাশয়ের পানিতে নেমে কচুরিপানা তুলে স্তূপ করছেন কৃষকেরা। পরে ভ্যান, রিকশা কিংবা অন্যান্য যানবাহনে করে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাড়িতে। সেখানে পরিষ্কার করে কেটে খড়, ঘাস বা অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে গবাদিপশুকে খাওয়ানো হচ্ছে।
করিমগঞ্জ উপজেলার রৌহা গ্রামের জেসি এগ্রো ফার্মের ব্যবস্থাপক হোসেন মোহাম্মদ রিয়াদ বলেন, “গরুর জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ খাবার দরকার, তা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে জমি থেকে খড় ও ঘাস পাওয়া যেত, এখন সেগুলোর সংকট। তাই বাধ্য হয়ে কলাগাছ কেটে গাভিকে খাওয়াচ্ছি। এর সঙ্গে ভুসি ও অন্যান্য খাবারও দিতে হচ্ছে। গো-খাদ্যের দাম কমানো বা সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে কৃষকদের জন্য অনেক উপকার হতো।”
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চৌদ্দশত ইউনিয়নের দরবারপুর গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন বলেন, “এবার অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসলও ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারিনি। এতে মানুষের খাবারের পাশাপাশি গরুর খাদ্যেরও সংকট দেখা দিয়েছে। খাল-বিলে কচুরিপানা না থাকলে গরুগুলো বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে যেত।”
তিনি বলেন, “আগে কচুরিপানাকে কেউ তেমন গুরুত্ব দিত না। জলাশয়ে বেশি হলে আগাছা মনে করে তুলে ফেলে দেওয়া হতো। এখন গরুর খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এটিই অনেকটা ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু কচুরিপানা দিয়ে গরুর খাবারের চাহিদা পূরণ করা যায় না। এর সঙ্গে অন্য খাবারও দিতে হয়।”
সদর উপজেলার বটকিলা গ্রামের বাচু মিয়াকে রৌহা বিল থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, “ভুসি, দানাদার খাবার ও রেডি ফিডের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এসব কিনে গরুকে ঠিকমতো খাওয়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূর থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করতে এসেছি।”
নিজের গরুর কথা বলতে গিয়ে বাচু মিয়া বলেন, “একটি ছোট বাছুর ৪৬ হাজার টাকা দিয়ে কিনে প্রায় চার বছর ধরে লালন-পালন করছি। গরুটি এখন দুধ দেয়। প্রতিদিন প্রায় ছয় লিটার দুধ পাওয়া যায়। এই গরুটি আমাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই খাবারের সংকট হলেও কোনোভাবে লালন-পালন করে যাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। সব খাবার বাজার থেকে কিনে দিলে দুধ বিক্রি করে তেমন লাভ থাকে না। তাই কচুরিপানা, খড় ও অন্যান্য স্থানীয় খাবার সংগ্রহ করে খরচ কমানোর চেষ্টা করছি।”
সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের সল্প যশোদল নোয়াপাড়া গ্রামের কৃষক রাকিব মিয়া বলেন, “আগে বাড়িতে উৎপাদিত ধানের খড় দিয়েই কয়েক মাস গরু পালন করা যেত। এবার ফসলের ক্ষতির কারণে খড় কম হয়েছে। বাইরে থেকে খড় কিনতে হচ্ছে। তার ওপর ভুসি ও অন্যান্য খাবারের দামও বেশি। সব মিলিয়ে গরু পালন এখন আগের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল।”
তিনি বলেন, “কচুরিপানা বিনা খরচে পাওয়া যায়। তাই জলাশয় থেকে তুলে এনে অন্য খাবারের সঙ্গে গরুকে দিচ্ছি। এতে কিছুটা হলেও খরচ কমানো যাচ্ছে। এখন গরু পালন করতে হলে শুধু বাজারের খাবারের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কঠিন।”
কৃষক রাকিব বলেন, “বাজারে গরুর মাংস ৮০০ টাকা কেজি ধরে বিক্রি হয়। কিন্তু গরু বিক্রি করতে নিয়ে গেলে অনেক সময় সেই হিসাবে দাম পাওয়া যায় না। খাদ্যের দামও বেশি। ফলে খামারিরা দুই দিক থেকেই চাপে আছেন।”
তাড়াইল উপজেলার দামিহা ইউনিয়নের কাজলা (বগারবাইদ) গ্রামের খামারি নজরুল ইসলাম বলেন, “একসঙ্গে কয়েকটি গরু পালন করি। প্রতিদিন অনেক খাবারের প্রয়োজন হয়। বাজার থেকে সব খাবার কিনে দিলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনও ধরে রাখা কঠিন।
প্রান্তিক খামারিরা বলছেন, খাদ্যের দাম বাড়লেও গরু বিক্রি করে দেওয়া তাদের জন্য সহজ কোনো সমাধান নয়। কারণ এসব গবাদিপশুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের সঞ্চয়, ঋণ, শ্রম ও ভবিষ্যতের আশা। অনেকেই বছরের পর বছর গরু পালন করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রির মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। তাই সাময়িক খাদ্যসংকটের কারণে গরু বিক্রি করে দিলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জে বর্তমানে গবাদিপশুর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ৯ লাখ ২২ হাজার ৪৪৯টি এবং মহিষ ৭ হাজার ৭৪৫টি। এছাড়া জেলায় বছরে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ৭৫ দশমিক ০৩ লাখ মেট্রিক টন। এত বিপুলসংখ্যক গবাদিপশুর খাদ্যের বড় একটি অংশ স্থানীয় কৃষি উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ফসলের উৎপাদন কমে গেলে একই সঙ্গে কমে যায় খড় ও অন্যান্য কৃষিজাত উপজাতের জোগান। এতে গবাদিপশুর খাদ্যের বাজারে চাপ তৈরি হয় এবং বাড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “কচুরিপানায় পুষ্টিমান বা খাদ্যগুণ খুব বেশি নয়। তবে এটি সবুজ ঘাসের মতো এক ধরনের বাল্ক ফিড হিসেবে গবাদিপশুকে খাওয়ানো হয়। খাদ্যের সংকটের সময় অনেক খামারি কচুরিপানা ব্যবহার করছেন।”
তিনি বলেন, “পরিমিত পরিমাণে কচুরিপানা খাওয়ালে সাধারণত সমস্যা হয় না। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে কোনো খাদ্যই গবাদিপশুর জন্য ভালো নয়। তাই কচুরিপানার পাশাপাশি খড়, ঘাস, ভুসি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যও গবাদিপশুর খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, “চলতি বছরের এপ্রিল মাসে টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জে ১১ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৫২ হাজার ৯৮০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফসল উৎপাদনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগের হিসাবে এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭২ কোটি ২৪ লাখ টাকা।”
তিনি বলেন, “ফসলের পাশাপাশি খড়ও নষ্ট হওয়ায় বর্তমানে গো-খাদ্যের সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এ সংকটও ধীরে ধীরে কেটে যাবে।”
কেকে/সাশ