বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ১৮ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার      বিগত সরকারের প্রকল্পের দুর্নীতির তদন্ত হচ্ছে, রিপোর্ট পেলে ব্যবস্থা : প্রধানমন্ত্রী      ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে : রাষ্ট্রপতি      ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলবে ইলেকট্রিক ট্রেন : প্রধানমন্ত্রী      রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী পদের আগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা      সেপ্টেম্বরের শেষে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ হতে পারে : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী      পলিথিন-প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      
দেশজুড়ে
আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়
শীঘ্রই দখলমুক্ত হচ্ছে বাঁকখালী নদী
মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২৯ পিএম আপডেট: ০৯.০৯.২০২৬ ৮:৩৪ পিএম
ছবি: প্রতিবেদক

ছবি: প্রতিবেদক

কক্সবাজার শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বাঁকখালী নদী দখল ও দূষণমুক্ত করতে একে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে, এর সীমানায় থাকা সব দখলদারকে উচ্ছেদের নির্দেশও দেন আদালত।

শহরের প্রাণরেখা বাঁকখালী নদী ও বিলুপ্তপ্রায় প্যারাবন উচ্ছেদ করে অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে যাওয়ার পর এবার তা পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার করার আইনি পথ উন্মুক্ত হলো। আদালতের সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত নির্দেশনার পর নদীটির পুরো সীমানা দখলমুক্ত করতে শিগগিরই সমন্বিত ও বড় ধরনের অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।

​এর আগে বিগত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে বাঁকখালী নদীর দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছিল প্রশাসন। সে সময় কিছু অংশ মুক্ত করা সম্ভব হলেও দখলদার চক্রের ইন্ধনে স্থানীয়দের তীব্র বাধা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে পড়ে একপর্যায়ে অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে নদীর একটি বড় অংশ অবৈধ দখলেই থেকে যায়।

​তবে সম্প্রতি উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায় প্রকাশের পর সেই আইনি ও প্রশাসনিক বাঁধা পুরোপুরি দূর হয়েছে। আদালতের রায়ে নদীর সিএস এবং আরএস নকশা অনুযায়ী মূল সীমানা বজায় রেখে বাঁকখালীর সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা অনতিবিলম্বে গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

​জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আর কোনো ধরনের বাঁধার কাছে নতিস্বীকার করা হবে না। অভিযান সফল করতে একটি শক্তিশালী যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে, যাতে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএ সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

অভিযানকালে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং শক্ত হাতে বাঁধা মোকাবিলার জন্য বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশসহ পর্যাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন রাখার প্রস্তুতি চলছে।

পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহল প্রশাসনের এপদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, বাঁকখালী নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়া এবং তীরের প্যারাবন ধ্বংসের কারণে কক্সবাজার শহর মারাত্মক পরিবেশগত ঝুঁকিতে রয়েছে।

আদালতের এ রায়ের বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীটি আবার তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রায়ের পুর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। হাইকোর্ট তার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, আগামী ৪ মাসের মধ্যে বাঁকখালী নদী ও এর আশপাশের এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, আরএস ও বিএস ম্যাপ অনুযায়ী এবং নদীর বর্তমান প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ ও পিলার স্থাপন করার নির্দেশ দেন।

এছাড়া, আগামী ৪ মাসের মধ্যে সব অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং নদীকে দূষণমুক্ত, নদীর দুই তীরে উজাড় হওয়া উপকূলীয় বন পুনরায় পুনরুদ্ধার বা বনায়ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত এ মামলাটিকে কন্টিনিউয়াস ম্যানডামাস বা চলমান তদারকি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর ফলে নদী রক্ষায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তার অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রতি বছর জানুয়ারি এবং জুলাই মাসে (প্রতি ছয় মাস পরপর) নিয়মিতভাবে আদালতে জমা দিতে হবে বলা হয়েছে।

কলম্বিয়ার আত্রাতো ও পেরুর মারানিওন নদীর উদাহরণ টেনে আদালত মনে করিয়ে দেন নদী শুধু একটি জলধারা নয়, এর নিজস্ব আইনি সত্তা ও অধিকার রয়েছে। দখল থেকে বাঁকখালী নদীকে মুক্ত করে এর জৌলুস ফিরিয়ে আনতে ২০১৪ সালে প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। মামলাটি বানচাল করতে এর বিরুদ্ধে দখলকারীরা ২০২৩ সালে অপর একটি মামলা দায়ের করে, যা গত ২৪ আগস্ট খারিজ করে দেন আদালত।

হাইকোর্ট বাঁকখালী নদীর দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করে আগামী চার মাসের মধ্যে উচ্ছেদ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। সেই সঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে নদীটিকে “প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা দিতে এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থাপনা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

সে সময় হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, বাঁকখালী নদীর বর্তমান প্রবাহ ও আরএস জরিপ অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া, পূর্বে প্রদত্ত রুল চূড়ান্তকরণের মাধ্যমে নদী ও নদীসংলগ্ন এলাকাগুলো অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইজারা প্রদান বন্ধ করতে হবে, পূর্বে দেওয়া সব ইজারা বাতিল করতে হবে, নদী এলাকার ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার করতে হবে।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, দুই যুগ আগে সৃজিত প্যারাবন ধ্বংস করে প্রায় ৩০০ একর বনভূমিতে তৈরি হয়ে আধা পাকা চার শতাধিক ঘরবাড়ি। সব কটি বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগসহ নাগরিক সুবিধার সবকিছু ছিল। বাসাবাড়িতে ভাড়ায় থাকছেন ভাসমান মজুরশ্রেণির মানুষ।

কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ অভিযান চালিয়ে কস্তুরাঘাটের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন। তখন দখলমুক্ত করা হয় বাঁকখালী নদীর ৩০০ একরের বেশি প্যারাবনের জমি। কিন্তু কিছুদিনের মাথায় উচ্ছেদ করা ভূমিতে আবার নির্মিত হয় ঘরবাড়ি, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা। অনেকে টিনের বেড়া দিয়ে জলাভূমি ঘিরে রাখে।

পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা বলেন, আড়াই বছর আগে নদীর ওপর প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৯৫ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন থেকে ভূমিদস্যুদের নজর পড়ে সেতুর দুই পাশের প্যারাবনের দিকে। এ পর্যন্ত অন্তত ৬০০ একরের বেশি প্যারাবন ধ্বংস করে তাতে নির্মিত হয়েছে পাকা-সেমি পাকা ঘরবাড়ি, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা। অথচ তিন দশক আগেও নদীর কস্তুরাঘাট ছিল শহরের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে উৎপত্তি হয়ে ৩৪ কিলোমিটারের নদীটি রামু ও কক্সবাজার সদর হয়ে শহরের কস্তুরাঘাট-নুনিয়াছটা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নুনিয়াছটা থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটারে ১ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।

পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, ‘খুরুশকুলে যাতায়াতের জন্য নির্মিত সেতুর কারণেই নদীর মরণদশা যাচ্ছে। দখল-দূষণে নদীটি সংকুচিত হয়ে এখন (সেতুর গোড়ার অংশ) ২০০ ফুটের কাছাকাছি এসে ঠেকেছে। তাতে নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।’

গত বছরের ২৩ মে জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভা। তাতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান সারোয়ার মাহমুদ বিএস দাগ অনুসরণ করে নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, সীমানা নির্ধারণ এবং দখলদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২০১৪ সালের তালিকায় দখলদার ছিল ৫১ জন। ২০২০ সালের দখলদারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩১ জনে।

পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট পিপলের প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, ‘কস্তুরাঘাটের বদরমোকাম থেকে পেশকারপাড়া পর্যন্ত পাঁচটি দাগে নদী, খাল ও বালুচর শ্রেণির কয়েকশ একর সরকারি জমি দখল করে তাতে ১ হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।’

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  কক্সবাজার   দখলমুক্ত   বাঁকখালী নদী   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close