ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও উপকূলীয় জনপদে দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নদীর তীর, বসতভিটা, কৃষিজমি, সড়ক ও বেড়িবাঁধ ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। চরফ্যাশন কয়েকটি জায়গাতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়িবাঁধ ভাঙছে। প্রভাবশালি হওয়ায় স্থানীয়রা বালু উত্তোলন কারীদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারতে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তেঁতুলিয়া ও মেঘনার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় নদীর মাঝে প্রকাশ্যেই ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে। উত্তোলিত বালু বাল্কহেডে করে বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন ও বিক্রি করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ কর্মকাণ্ড চললেও স্থায়ীভাবে বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরফ্যাশন উপকূলের মেঘনা নদীতে বালু উত্তোলনের জন্য বৈধ বালুমহাল বা ইজারা ব্যবস্থা না থাকলেও বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার দিয়ে প্রভাবশালীদের নাম ব্যবহার করে বালু উত্তোলন চলছে। ফলে অনুমোদন ছাড়া নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
মেঘনার তীরে বেতুয়া ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে গেলে কতিপয় প্রভাবশলিদের সন্ত্রাসীরা বাঁধা দেয়। এভাবে বালু উত্তোলন করতে থাকলে নদীভাঙন, বেড়িবাঁধে ধস ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চরফ্যাশন প্রেস ক্লাবের সম্পাদক কামাল গোলদার বলেন, ‘অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে বদলে যাচ্ছে নদীর তলদেশ
নদী থেকে অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন ও পানির প্রবাহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নদী তীরের কাছাকাছি এলাকা থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলন করা হলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন এবং নদীর তীরভাঙ্গার আশঙ্কা থাকে।’
স্থানীয় আকতার হোসেন চৌকিদার জানান, বেতুয়া ও নতুন স্লুইজের আশপাশের নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি রয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। নদীভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি ও স্থানীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিপাকে পড়বে বেড়িবাধ এলাকার মানুষ।
চরফ্যাশন প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও বাংলাদেশ অটোরাইজ মালিক সমিতির সভাপতি সাইদ জুলফিকার মাহমুদ নিয়াজ বলেন, ‘মেঘনা নদীর তলদেশ থেকে অব্যাহত বালু উত্তোলন করা হলে ভোলা উপকূল হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। ভোলা জেলার বেড়িবাঁধ, সড়ক ও বৃহৎ জনপদের মানুষের নিরাপত্তায় বেড়িবাঁধ রক্ষায় প্রশাসন ও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
তিনি বলেন, ‘মাঝ নদীতে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে নদীতীরের মাটি দুর্বল হয়ে বর্ষা ও প্রবল স্রোতে সময় তীব্র ভাঙ্গনের আশঙ্কা থাকে। এতে বেড়িবাঁধ, সড়ক ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
মেঘনা তীরবর্তী বেতুয়া ছাড়াও শশীভূষণ, হাজারীগঞ্জ, খেজুরগাছিয়া, আবদুল্লাহপুর, নীলকমল ও ঘোষেরহাটসহ তেতুলিয়া নদিতে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ। ফলে বেড়িবাঁধ ও নদীর তীর চরম ঝুঁকিতে।
স্থানীয়রা জানান, নদী থেকে উত্তোলন করে বেতুয়া ও আশপাশের এলাকায় এনে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে স্থানীয় বাজারসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য এসব বালু বিক্রি করা হচ্ছে। বেতুয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এলাকায় অর্ধ শতাধিক ড্রেজার ও বাল্কহেড ব্যবহার হচ্ছে, তবে সরকারিভাবে নির্ভরযোগ্য কোনো তালিকা পাওয়া যায়নি। তেমনি
অবৈধভাবে বালু বিক্রি করায় সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দেন দাবি, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হবে। নদী ও উপকূল রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে নদীভাঙন ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
কেকে/এআই