বিমানবন্দরে তখন অপেক্ষায় স্বজনেরা। অপেক্ষার অবসান হলো সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে। তবে প্রিয় মানুষটির দেখা মিলল কফিনের ভেতর। স্পেনের মাদ্রিদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ নিয়ে বিমানটি ঢাকায় নামতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কফিন পৌঁছায় গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরগাঁও গ্রামের বাড়িতে। বাদ জুমা উত্তরগাঁও উত্তরপাড়া জামে মসজিদে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ২৫ বছর বয়সী আলিফকে।
মাত্র দুই মাসের প্রবাসজীবনেই শেষ হলো তার ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। যে বাড়ি থেকে নতুন জীবনের আশায় স্পেনের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই বাড়িতেই ফিরতে হলো নিথর দেহে।
আলিফ কালীগঞ্জের উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুন দম্পতির ছেলে। পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে দুই মাস আগে স্পেনে যান তিনি। মাদ্রিদে ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে তিনি কাজের অনুমতিও পান।
নতুন কাজের অনুমতি পাওয়ার আনন্দে যখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা, ঠিক তখনই নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া।
গত ৩০ আগস্ট স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে মাদ্রিদের আরগানসুয়েলা এলাকার পালোস দে লা ফ্রন্তেরার কাইয়ে কানারিয়াস সড়কের একটি সাইকেল গ্যারেজে আগুন লাগে। গ্যারেজের ভেতর আটকা পড়েন আলিফ। আগুনের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া। শ্বাস নিতে না পেরে সহকর্মীদের সঙ্গে থাকা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সাহায্যের আকুতি জানান তিনি।
তার শেষ বার্তা ছিল, “আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
এরপর আর কোনো বার্তা আসেনি।
খবর পেয়ে মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলের ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং গ্যারেজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করা হয়। আগুন পুনরায় ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সেখানে থাকা অন্যান্য ইলেকট্রিক বাইসাইকেলও বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকেরা আলিফকে মৃত ঘোষণা করেন। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, বিষাক্ত ধোঁয়া ও শ্বাসনালিতে মারাত্মক দাহ্য ক্ষতের কারণে তার মৃত্যু হয়।
আলিফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্পেনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। গত ৪ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে প্রবাসীরা কাঁধে করে বহন করেন তার নিথর দেহ। চোখের জলে জানান শেষ বিদায়।
এরপর শুরু হয় মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া। আইনি ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১০ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের টিকে-১৩৬০ ফ্লাইটে আলিফের কফিনবন্দী মরদেহ ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখান থেকে টিকে-৭৪২ ফ্লাইটে করে মরদেহ আসে বাংলাদেশে।
শুক্রবার সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ করে। নির্ধারিত সময়ের ২৩ মিনিট বিলম্বে বিমানটি ঢাকায় পৌঁছায়। এরপর ঢাকা থেকে কালীগঞ্জ, আর কালীগঞ্জ থেকে উত্তরগাঁওয়ের পারিবারিক কবরস্থান—সেখানেই থামল আলিফের পথচলা।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর উত্তরগাঁও এলাকায় নেমে আসে শোকের আবহ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা ছুটে আসেন শেষবারের মতো আলিফকে দেখতে।
কয়েক মাস আগেও এই বাড়ি থেকেই হাসিমুখে বিদেশের পথে যাত্রা করেছিলেন তিনি। তখন পরিবারের চোখে ছিল স্বপ্ন—ছেলে বিদেশে গিয়ে কাজ করবে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে, পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন করবে। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, “সকালে প্রবাসী বাংলাদেশি ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।”
কেকে/সাশ