কোনোটি শিকড়, কোনোটি বাকল; কোনোটির পাতা, আবার কোনোটি শুকনো ফল কিংবা বীজ। দেখতে অনেকটা সাধারণ গাছ-গাছড়ার মতো হলেও এসব উপাদানের রয়েছে দীর্ঘদিনের লোকজ ও আয়ুর্বেদিক ব্যবহারের ইতিহাস।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা ভূমি অফিসের দক্ষিণ পাশে এমনই নানা ধরনের ভেষজ উপাদানের সমাহার গড়ে তুলেছেন শিমুল দাস।প্রায় এক দশক ধরে ‘দাস ট্রেডার্স’ নামে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় দেশীয় নানা ভেষজ ও আয়ুর্বেদিক উপাদান।
দাস ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শিমুল দাসের দাবি, তার সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ২০ হাজার ধরনের গাছ-গাছড়া ও ভেষজ উপাদান।
স্থানীয়দের কাছে প্রতিষ্ঠানটি পরিচিত হয়ে উঠেছে ভেষজের দোকান হিসেবে। দূর-দূরান্ত থেকেও কেউ কেউ আসেন বিভিন্ন ধরনের শুকনো ভেষজ, মসলা ও আয়ুর্বেদিক উপাদানের খোঁজে। দোকানের তাকজুড়ে দেখা যায় অশ্বগন্ধা, যষ্টিমধু, অর্জুনের ছাল, হরীতকী, বহেড়া, আমলকী, নিম, থানকুনি, শতমূলী, বাসক, তুলসী, ঘৃতকুমারী (অ্যালোভেরা), কালোজিরা, আদা, লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ, মেথিসহ নানা ধরনের উপাদান।
শিমুল দাসের ভেষজের প্রতি আগ্রহ অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি। প্রায় দুই দশকেরও বেশি আগে খুলনায় যাতায়াতের সময় এ আগ্রহের সূত্রপাত। পারিবারিক কাজে ২০০০, ২০০১, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে খুলনায় ভগ্নিপতির বাসায় যেতেন তিনি। ভগ্নিপতির মসলার ব্যবসা ছিল। সেই দোকানের পাশেই ছিল একটি ভেষজের দোকান। অবসর সময়ে সেখানে গিয়ে বসতেন শিমুল। দোকানে থাকা বিভিন্ন ভেষজ নিয়ে জানতে চাইতেন। কোন গাছের কী ব্যবহার, কোন অংশ কীভাবে কাজে লাগে—এসব জানতে জানতে তার আগ্রহ বাড়তে থাকে।
শিমুল দাস বলেন, “ভেষজের দোকানে গিয়ে মাঝে মাঝে সময় কাটাতাম। বিভিন্ন ভেষজের বিষয়ে জানতে চাইতাম। কোনটার কী কাজ, কোন গাছের কোন অংশ ব্যবহার করা হয়—এসব জানার চেষ্টা করতাম। এভাবেই ধীরে ধীরে ভেষজের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়।”
পরে বিদেশে গিয়ে আয়ুর্বেদিক বিষয়েও বিভিন্ন বই পড়াশোনা ও জানার চেষ্টা করেন তিনি। দেশে ফিরে একপর্যায়ে কর্মহীন হয়ে পড়েন। এরই মধ্যে শুরু হয় করোনাভাইরাসের মহামারি। সে সময় ভেষজ উপাদানের ব্যবহার নিয়ে তার আগ্রহ আরও বাড়ে।
শিমুল দাস বলেন, “করোনার সময় আমরা পরিবারের সবাই চায়ের সঙ্গে আদা, লবঙ্গ, তেজপাতা, যষ্টিমধু ও গরম মসলা দিয়ে চা বানিয়ে খেতাম। পরিচিত অন্যদেরও এমন চা খেতে উৎসাহিত করতাম। তখন থেকেই মনে হলো, ভেষজ ও আয়ুর্বেদিক বিষয় নিয়ে আরও কাজ করা দরকার।”
তবে ভেষজ উপাদানকে তিনি কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে প্রচার করতে চান না।
তার ভাষ্য, মানুষের মধ্যে ভেষজ উদ্ভিদ সম্পর্কে আগ্রহ ও সচেতনতা তৈরি করাই তার অন্যতম উদ্দেশ্য। ভেষজ মানেই সব রোগের ওষুধ—এমন কথা আমি বলি না। কোন উপাদান কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আমি মূলত ভেষজ উপাদান সংগ্রহ ও মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলার চেষ্টা করছি।
বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর নিজের আগ্রহ ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে আয়ুর্বেদিক ও ভেষজ পণ্যের ডিসপেনসারি দেওয়ার উদ্যোগ নেন শিমুল দাস। এরপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে দাস ট্রেডার্স। বর্তমানে প্রায় ১০ বছর ধরে চলছে প্রতিষ্ঠানটি।
দোকানে আসা রেজাউল বিশ্বাস বলেন, “এখানে অনেক ধরনের ভেষজের নাম আগে শুনলেও চোখে দেখিনি। বিশেষ করে যেসব শুকনো গাছের শিকড়, ছাল, পাতা বা বীজ সাধারণ বাজারে পাওয়া যায় না, সেগুলো এখানে পাওয়া যায়। তাই এলাকার মানুষের মধ্যে দোকানটি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা রায়হান মোল্লা বলেন, “ভেষজ জিনিস সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই তেমন ধারণা নেই। দাস ট্রেডার্সে বিভিন্ন ধরনের গাছ-গাছড়া ও ভেষজ উপাদান দেখতে পাওয়া যায়। তবে কোনটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সেটি বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।”
শিমুল দাস জানান, ভেষজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উপাদান সংগ্রহের চেষ্টা করেন তিনি। কিছু উপাদান স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়, আবার কিছু আসে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে।
দুর্লভ কিছু ভেষজ সংগ্রহ করতে তাঁকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয় বলেও জানান তিনি।
তার সংগ্রহে থাকা উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে অশ্বগন্ধা, শতমূলী, যষ্টিমধু, অর্জুনের ছাল, বাসক, হরীতকী, বহেড়া, আমলকী, নিম, থানকুনি, তুলসী, কালোজিরা, ঘৃতকুমারী, আদা, লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ ও মেথিসহ নানা ভেষজ ও মসলা। এসবের অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে উপমহাদেশের লোকজ ও আয়ুর্বেদিক চর্চায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
শিমুল দাস বলেন, “আমার ইচ্ছা শুধু ব্যবসায় করা নয়। আমাদের দেশে অনেক মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ রয়েছে, যেগুলোর নাম বা ব্যবহার নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না। আমি চাই এসব উপাদান সংগ্রহের পাশাপাশি মানুষকে ভেষজ সম্পর্কে জানাতে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা আছে।”
স্থানীয়দের মতে, গ্রামবাংলার বহু পরিচিত গাছ-গাছড়া হারিয়ে যাওয়ার পথে। একসময় বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে কিংবা পতিত জমিতে যেসব ভেষজ উদ্ভিদ সহজেই দেখা যেত, এখন সেগুলোর অনেকটাই দুর্লভ। ফলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে হলেও এসব উপাদান সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিষয়টি ইতিবাচক বলে মনে করছেন তারা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক বা ভেষজ উপাদান হলেও সবকিছু সবার জন্য নিরাপদ—এমন ধারণা ঠিক নয়। কোনো রোগের চিকিৎসায় ভেষজ ব্যবহার, প্রচলিত ওষুধ বন্ধ করা কিংবা দীর্ঘদিন কোনো ভেষজ সেবনের আগে যোগ্য চিকিৎসক বা আয়ুর্বেদিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বোয়ালমারীর ব্যস্ত এলাকার পাশে ছোট্ট একটি দোকান থেকে শুরু হওয়া শিমুল দাসের এই উদ্যোগ এখন স্থানীয়দের কাছে ভেষজের এক ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা। বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশীয় ভেষজ উদ্ভিদ সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ তৈরি এবং হারিয়ে যেতে বসা উদ্ভিদ সংরক্ষণে উদ্যোগটি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয়দের।
কেকে/এমএ