হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে বিতর্ক যেন থামছেই না। লাগেজ ট্রলির সংকট, লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং যাত্রীসেবার নানা অসুবিধা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা ক্রমেই রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরোধ এবং পরবর্তী সময়ে তার গ্রেপ্তারের ঘটনায় তার পক্ষে সোচ্চার হয়েছে। কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা তার কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন যে তিনি বিমানবন্দরের অনিয়মের প্রতিবাদ করেছিলেন। তাদের কেউ কেউ বিমানবন্দরকে ‘মাছের বাজার’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন।
যুক্তির খাতিরে আমরা এই বর্ণনাটি মেনে নিই। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন এসে যায়—ঢাকার বাকি অংশ কি এই কথিত মাছের বাজার থেকে খুব বেশি আলাদা?
বিমানবন্দরে যাওয়ার রাস্তাগুলোর কথাই ধরা যাক। মহাখালী, টঙ্গী, আসাদগেট কিংবা মণিপুরীপাড়া—যেদিক দিয়েই বিমানবন্দরে যাওয়া হোক না কেন, নগর ব্যবস্থাপনার কী চিত্র আমাদের চোখে পড়ে? এসব এলাকার যানবাহনের শৃঙ্খলা, গণপরিবহন ব্যবস্থা, রাস্তার ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক পরিবেশের সাথে লন্ডন, প্যারিস, দুবাই কিংবা নিউইয়র্কের তুলনা কি আমরা সত্যিই করতে পারি? যদি না পারি, তাহলে শুধু আমাদের বিমানবন্দরের সঙ্গেই কেন সেসব দেশের বিমানবন্দরের তুলনা করতে হবে?
কয়েক বছর আগের একটি অভিজ্ঞতা আমার মনে পড়ছে। একজন জাপানি বিনিয়োগকারী আমার সঙ্গে দেখা করতে ঢাকায় এসেছিলেন। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে কাছের গোলচত্বরের দিকে এগোতেই তিনি রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর বিশৃঙ্খল দৃশ্য দেখে তার বিস্ময়ের সীমা ছিল না।
এবার সড়কপথের বাইরে একটু তাকানো যাক
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পিজি হাসপাতাল কিংবা দেশের প্রায় যেকোনো বড় সরকারি হাসপাতালে একবার ঘুরে আসুন। রোগী ও তাদের স্বজনদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা বিবেচনা করুন। অতিরিক্ত ভিড়, দীর্ঘ অপেক্ষা, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং সেবা পেতে নানা ধরনের হয়রানি সেখানে নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।
আরও উদ্বেগজনক হচ্ছে চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ, যার কোনো কোনোটি মানুষের প্রাণহানিও ঘটে। অনেক বেসরকারি হাসপাতালের চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয়।
লাগেজ পেতে বিলম্ব কিংবা লাগেজ হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এসব ব্যর্থতার তুলনা চলে না। কারণ চিকিৎসাসেবায় এ ধরনের ব্যর্থতার পরিণতি সব সময় অপূরণীয়।
এরপর আমাদের আদালত, ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস এবং বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকানো যাক। এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা কতটা সন্তোষজনক? অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিল প্রক্রিয়া এবং কোথায় গেলে কাজ হবে, সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়া নিত্যদিনের ব্যাপার।
আর বাংলাদেশ সচিবালয়ের কথাই বা বাদ যায় কীভাবে? সচিবালয়ে রাজনৈতিক কর্মীসহ বিপুলসংখ্যক বহিরাগত মানুষের যাতায়াত আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সভ্য দেশে নিজেদের কাজের জন্য এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে কেন সচিবালয়ে যেতে হবে?
বিমানবন্দর যদি আমাদের সম্মানিত রাজনৈতিক নেতাদের ভাষায় ‘মাছের বাজার’ হয়ে থাকে, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য আমরা কী বিশেষণ ব্যবহার করব?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে যেসব রাজনৈতিক নেতা আজ এত সোচ্চার, তারা কি আমাদের হাসপাতাল, আদালত, ভূমি অফিস, জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং সচিবালয়ের সংস্কারের দাবিতেও একই রকম সোচ্চার হয়েছেন? যেসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষ সমপরিমাণ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি দুর্ভোগের শিকার হন, সেসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একই রাজনৈতিক উদ্বেগ, জনমনোযোগ এবং সংস্কারের দাবি কি আমরা দেখতে পাই? অবস্হাদৃষ্টে মনে হয়, আমরা সারা দেশের বিশৃঙ্খলা এবং অনিয়মকে মেনে নিতে প্রস্তুত, কিন্তু বিমানবন্দরটিকে স্বর্গ উদ্যান হিসাবে দেখতে চাই।
নিশ্চয়ই আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ মানের সেবা ও ব্যবস্থাপনা থাকা উচিত। বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রথম ধারণা তৈরির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার এটি। কিন্তু আমাদের সমালোচনা ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ কেন শুধু বিমানবন্দরকে ঘিরেই আবর্তিত হবে? উন্নত শাসন ব্যবস্থার জন্য আমাদের প্রত্যাশা কেন বিমানবন্দরের সীমানা পেরিয়ে এগোবে না? একটি বিমানবন্দর যে দেশের অংশ, সেই দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিচালিত হতে পারে না।
এই বিতর্কের আরেকটি দিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা মেজর আখতারুজ্জামানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু একজন যাত্রীর অভিযোগ যথার্থ হলেই সেই অভিযোগ প্রকাশের মারমুখী পদ্ধতিও গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়—এমন যুক্তির যথার্থতা আছে বলে মনে হয় না।
আখতারুজ্জামান কোনো ফৌজদারি অপরাধ করেছেন কি না, সেই আইনি প্রশ্নটি আপাতত এক পাশে রাখা যাক। এখানে একটি নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে, বিশেষ করে এমন একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে, যারা ধর্মীয় আদর্শকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থান দেয়।
ন্যায়বিচার, সংযম, শালীনতা এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন—ধর্মের এসব শিক্ষা কি প্রতিবাদের নামে হুমকিমূলক ভাষা, আক্রমণাত্মক অঙ্গভঙ্গি কিংবা শারীরিক ভয়ভীতি প্রদর্শনকে সমর্থন করে? নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করার অধিকার কাউকে শালীনতা ও সংযম বজায় রাখার দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয় না।
এখানে একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। যাঁরা এ ধরনের প্রতিবাদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন, তাঁরা কি উপরে অন্যান্য যেসব ক্ষেত্রের আলোচনা করা হয়েছে সেসব ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রতিবাদ মেনে নিতে প্রস্তুত?
এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। সেটি হলো, বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণার অভাব।
সম্প্রতি জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের কয়েকটি টকশোতে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ একাধিক আলোচককে লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং যাত্রীদের মালামাল আত্মসাতের অভিযোগের জন্য বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে দায়ী করতে শুনেছি। তাঁদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা সিএএবি এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কার্যক্রমের পার্থক্য সম্পর্কে তাদের যথাযথ ধারণা নেই।
প্রতিষ্ঠান দুটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাদের দায়িত্বও ভিন্ন
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ মূলত বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বিমানবন্দরের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা, আকাশপথে বিমান চলাচলের সহায়ক সেবা, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। বিমানবন্দরের স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ এবং উড়োজাহাজ ও যাত্রীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। নিজস্ব ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি বিমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্যান্য এয়ারলাইনসকেও বাণিজ্যিক চুক্তির ভিত্তিতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়ে থাকে। এসব সেবার মধ্যে উড়োজাহাজের বিভিন্ন গ্রাউন্ড অপারেশন এবং যাত্রীদের লাগেজ হ্যান্ডলিং অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং যাত্রীদের চেক-ইন করা লাগেজ উড়োজাহাজে ওঠানো, নামানো এবং নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যক্ষ পরিচালনাগত দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস ও তার নিযুক্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই সেবার দায়িত্ব পালন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। কার দায়িত্ব কোথায়, তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গেলেই জবাবদিহিতা অর্থবহ হয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিকও এই পার্থক্য সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত নন। ফলে তারা এমন সব বিষয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে দায়ী করেন, যেগুলো মূলত সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস কিংবা তার গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। গণতান্ত্রিক সমাজে সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সম্পর্কে ভুল ধারণার ভিত্তিতে সমালোচনা করলে জনমনে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে পারে, কিন্তু সমস্যার প্রকৃত সমাধান নাও হতে পারে।
এই বিতর্কের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, লাগেজ চুরি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন ভিডিও এবং অভিযোগের প্রচার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের অনিয়ম দেখানোর দাবি নিয়ে অসংখ্য ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এসবের কিছুতে বাস্তব ঘটনা থাকতে পারে। আবার কিছু ভিডিও বিভ্রান্তিকর, প্রাসঙ্গিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন, সম্পাদনার মাধ্যমে বিকৃত কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান উৎকর্ষতার ফলে এমন দৃশ্য তৈরি করা এখন অনেক সহজ, যা দেখতে বাস্তব মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে কখনো ঘটেনি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি ভিডিওকে অপরাধের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার আগে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হারিয়ে যাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা কথিতভাবে আত্মসাৎ করা লাগেজ সম্পর্কে যাত্রীদের অভিযোগ আহ্বান করেছে। অভিযোগগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা ও যাচাই করা হলে এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই কার্যকর হতে পারে। তবে আমার নজরে আসা একটি অভিযোগ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
একজন যাত্রী অভিযোগ করেছিলেন যে তার একটি কার্টন খোলা হয়েছে এবং সেখান থেকে কয়েকটি জিনিস পাওয়া যাচ্ছে না।
অভিযোগটি পরীক্ষা করার পর প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রা শুরুর বিমানবন্দরেই কার্টনটি পরীক্ষার জন্য খোলা হয়েছিল। কারণ, এর ভেতরে কিছু নিষিদ্ধ সামগ্রী ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্টনের ভেতরে একটি লিখিত নোটিশ রেখে দিয়েছিল, যাতে কী কী সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করা ছিল। পরে অবশ্য ওই যাত্রী নোটিশটি পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কারও ওপর দায় চাপানোর আগে অভিযোগটি যথাযথভাবে যাচাই করা কতটা জরুরি।
একজন যাত্রী তার স্যুটকেস বা কার্টন খোলা অবস্থায় পেতে পারেন। কিন্তু সেটি যাত্রা শুরুর বিমানবন্দরে, ট্রানজিটের সময়, নাকি গন্তব্য বিমানবন্দরে খোলা হয়েছে, তা তাঁর জানা নাও থাকতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ও শুল্ক কর্তৃপক্ষ প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী লাগেজ পরীক্ষা করার ক্ষমতা রাখে। এ ধরনের পরীক্ষা মানেই চুরি কিংবা অসদাচরণ নয়।
এর অর্থ এই নয় যে ঢাকা বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি বা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উপেক্ষা করতে হবে। প্রকৃত অভিযোগ অবশ্যই তদন্ত করতে হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা এবং দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত না করেই বিমানবন্দরের কর্মীদের চোর আখ্যায়িত করাও সমানভাবে অন্যায়।
এখানে যাত্রীদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। এয়ারলাইনসগুলো সাধারণত যাত্রীদের পরামর্শ দিয়ে থাকে, মূল্যবান কিংবা জরুরি সামগ্রী যেন চেক-ইন লাগেজে না রাখে, কারন সেগুলো পরিবহনে বিধিনিষেধের আওতায় পড়ার বা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
স্বর্ণালংকার, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, মূল্যবান ইলেকট্রনিক সামগ্রী, নগদ অর্থ এবং অন্যান্য সংবেদনশীল জিনিসপত্র সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের কেবিন ব্যাগেজ-সংক্রান্ত নিয়ম মেনে সঙ্গে বহন করাই উচিত। জবাবদিহি দাবি করা আর প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করা এক বিষয় নয়।
বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে খুব কম ধারণা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে দেন বিমানবন্দরের কোন সমস্যার জন্য কে দায়ী। যাচাই না করা একটি ভিডিওকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে প্রচার করা হয়। জটিল পরিচালনাগত সমস্যাকেও কখনো কখনো রাজনৈতিক অভিযোগের সহজ উপকরণে পরিণত করা হয়।
এ ধরনের কাজকর্ম জনমনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয় না। রাজনৈতিক নেতারা কখনো কখনো জনসাধারণের ক্ষোভকে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী হন। তখন প্রকৃত অভিযোগ, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং অগ্রহণযোগ্য আচরণের বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।
এখান থেকেই আমাদের আবার ফিরে যেতে হয় সুশাসনের বৃহত্তর প্রশ্নে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বিদ্যমান।
আমরা বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বিদেশে পাচারের অসংখ্য অভিযোগ শুনেছি। রাজনৈতিক প্রভাব কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে দেয়, তার উদাহরণও আমাদের সামনে রয়েছে।
এমন বাস্তবতায় দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা থেকে একটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে—এমন প্রত্যাশা কি বাস্তবসম্মত?
এর অর্থ এই নয় যে বিমানবন্দরের অবহেলা, দুর্নীতি কিংবা অদক্ষতাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, স্থায়ী উন্নতির জন্য কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা, নতুন কিছু ট্রলি সরবরাহ করা কিংবা কোনো বিতর্কের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়েও অনেক বেশি কিছু প্রয়োজন। প্রয়োজন উন্নত ব্যবস্থাপনা, সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং ধারাবাহিক জবাবদিহিতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাজনৈতিক নেতাদের উপলব্ধি করতে হবে যে সুশাসনের দাবি কেবল সুবিধামতো নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য হতে পারে না।
বিমানবন্দরকে যদি দক্ষ করতে হয়, আমাদের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দক্ষ হতে হবে
বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের যেমন জবাবদিহি করতে হবে, তেমনি আদালত, ভূমি অফিস এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে।
বিমানবন্দরের যাত্রীরা যেমন মর্যাদা ও সম্মান পাওয়ার অধিকারী, তেমনি রোগী, বিচারপ্রার্থী, করদাতা এবং সরকারি সেবা নিতে আসা প্রত্যেক নাগরিকেরও একই অধিকার রয়েছে।
আর সরকারি কর্মকর্তাদের যদি তাদের ব্যর্থতার জন্য জবাব দিতে হয়, তাহলে রাজনৈতিক নেতাদেরও নিজেদের আচরণের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। আমাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হলে আমরা তার নিন্দা করব, অথচ নিজেদের রাজনৈতিক সহকর্মীদের একই ধরনের আচরণের পক্ষে দাঁড়াব—এমন দ্বৈতনীতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সংশ্লিষ্ট সকলকে একটি কথা প্রায়শই বলতে শুনা যায়—‘আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি দেশের দর্পন’। বর্তমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে কথাটি আমার কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। দর্পন নিজে কোনো প্রতিচ্ছবি তৈরি করে না। তার সামনে যা থাকে, সে কেবল সেটিই প্রতিফলিত করে।
আমাদের সড়কগুলো যদি বিশৃঙ্খল হয়, হাসপাতালগুলো যদি অতিরিক্ত ভিড়ে বিপর্যস্ত থাকে, সরকারি অফিসগুলো যদি অদক্ষতার শিকার হয়, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যদি অকারণে জটিল হয় এবং এমনকি সচিবালয়ও যদি অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের ভারে জর্জরিত থাকে, তাহলে বিমানবন্দরের দর্পনে আমরা কী প্রতিচ্ছবি দেখতে আশা করি?
আমাদের সেই প্রতিচ্ছবি পছন্দ না-ও হতে পারে। আমরা তার সমালোচনা করতে পারি। তার উন্নতি দাবি করতে পারি। কিন্তু আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবিকে তার পেছনের বাস্তবতা থেকে পৃথক করে দেখার প্রত্যাশা করা উচিত নয়।
রূপকথার কুৎসিত দানব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দরীর মুখ দেখতে আশা করতে পারে না।
আমরা যদি চাই আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠুক, তাহলে আগে আমাদের সেই বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করতে হবে। সমাধান বিমানবন্দর সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশা কমিয়ে দেওয়া নয়। সমাধান হলো সমগ্র দেশ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশার মান আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া।
সমগ্র দেশকে মাছের বাজারের অবস্থায় রেখে আমরা কেবল বিমানবন্দরটিকে স্বর্গের অংশ হিসেবে দেখতে চাইতে পারি না।
আর শুধু আয়নাকে দোষারোপ করে আমরা সেই বাস্তবতা বদলাতে পারব না। বদলাতে হবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তবতাকেই।
লেখক: সাবেক সামরিক কর্মকর্তা
কেকে/সাশ