শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬,
৭ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ৪৩০ রানের পাহাড় গিলে ইংল্যান্ডকে কাঁদাল লঙ্কানরা      ● দাম্মাম ও রিয়াদগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্থগিত       ● পিএইচপির ত্রুটির পর হ্যাকিংয়ের চেষ্টা কয়েক লাখ ছাড়াল      ● প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে কূটনীতিতে নতুন মোড়      ● ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৫১২      ● সাজেকে অবরোধকারীদের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ৯ সদস্য আহত      ● সাজেকে ইউপিডিএফ ৩০-৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে : আইএসপিআর      
খোলাকাগজ স্পেশাল
আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়ছে
সন্দেহেই ঘটছে প্রাণহানি
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন ভাঙার প্রবণতা থামছেই না। ঠুনকো ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলা-মারধর, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটছে। কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই তৈরি করা হচ্ছে মব। এতে সংঘবদ্ধ হয়ে নিরীহ মানুষের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। 

গত বুধবার দিবাগত রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘শিশুচোর’ সন্দেহে আলম শেখ নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মো. মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে অয়ন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। একটি সূত্রের দাবি— প্রায় দেড় মাস আগেও একই হাসপাতালে চুরির সন্দেহে অন্য একজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। 

শুধু শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই নয়, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে দেশজুড়ে। চলতি মাসের ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে দুই দফায় মারধর করা হয়। প্রথম দফায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে রাতে একদল লোক হাসপাতালে ঢুকে আবারও তাকে মারধর করে। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। 

একই দিনে নোয়াখালী সদরে চুরির সন্দেহে মো. কবির হোসেন নামের এক যুবককে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। পরে ইসলামগঞ্জ বাজার থেকে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে দেবীপুর এলাকায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কবির প্রতিবন্ধী ছিলেন। 

এ ছাড়া গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে চুরির সন্দেহে লাল বাদশা (১৮) ও মাইদুল (১৮) নামের দুই যুবককে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। পরে তাদের মাঠের পাশে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। সেখানে লাল বাদশার মৃত্যু হয়। আহত মাইদুলকে জীবিত উদ্ধার করে পুলিশ।

গত মাসের ১৯ সেপ্টেম্বর খুলনায় চুরির সন্দেহে নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে একটি মেসের ছাদে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তিনি ছাদ থেকে পড়ে যান। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, তাকে নির্যাতনের একপর্যায়ে ফোন করে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। 

এরও আগে চলতি বছরের ২৪ জুন দিবাগত রাতে নড়াইল সদর উপজেলায় চুরির সন্দেহে আনোয়ার হোসেন নামের এক যুবককে গাছের সঙ্গে বেঁধে সারা রাত নির্যাতন করা হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে নড়াইল সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে দলবদ্ধ সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে দেশে মব সহিংসতায় অন্তত ২৩৩ জন নিহত হয়েছেন। মাসভিত্তিক হিসাবে, জানুয়ারিতে ২১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৯, এপ্রিলে ২১, মে মাসে ৩২, জুনে ৩৩, জুলাইয়ে ৩১ এবং আগস্টে সর্বোচ্চ ৩৫ জন নিহত হন। সেপ্টেম্বরে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৩।

অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ২৭৫টি মামলা হয়। এরপর বিএনপি সরকারের সময় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় মামলা হয় ৩১৭টি। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের আইন-বিচার ও সামাজিক মূল্যবোধ সঠিকভাবে কাজ না করায় সমাজে এ ধরনের অপরাধ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খোলা কাগজকে বলেন, ‘অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি— মানুষ ছোটখাটো ঘটনায় বড় ধরনের অপরাধ করছে। প্রশ্ন হলো—মানুষ কেন এমন অপরাধ করছে? কেন নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে? এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে—যখন দেশের আইন, বিচার ও সামাজিক মূল্যবোধ যখন ঠিকভাবে কাজ করে না, তখন মানুষ ছোটখাটো ঘটনায় বড় ধরনের অপরাধ করে।’

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কেউ অন্যায়ের শিকার হলে সে দ্রুত ও সঠিক বিচার পাবে; দেশে এমন দৃষ্টান্ত আমরা যথেষ্টভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে ছোট হোক বা বড়, কোনো অন্যায়ের বিচার সময়মতো না হলে মানুষের মনে হতাশা তৈরি হয়। তারা মনে করে, নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার নিজে না করলে রাষ্ট্র তার হয়ে বিচার করবে না। ফলে কেউ কেউ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে বা প্রতিশোধ নিতে চায়।’ 

তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কথা ও মতামত বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের ক্ষমতা দিয়ে সমাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চান। আরেকটি বড় ঘাটতি হলো— মানুষের মধ্যে সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলার যথাযথ উদ্যোগ নেই। স্বাধীনতার পর থেকে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, কিন্তু পরিকল্পিতভাবে কাজ হয়নি।’

ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, অন্যের মতামতকে কীভাবে সম্মান করতে হবে, রাগ বা বিরোধের সময় কীভাবে নিজেকে সামলাতে হবে; এসব বিষয়ে আমাদের শিক্ষা ও চর্চা খুবই কম। জনসমক্ষে মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও আমাদের যথেষ্ট শিক্ষা নেই।’ 

এদিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার (মুন) খোলা কাগজকে বলেন, ঘটনাটি হাসপাতালের সামনে ঘটেছে। আর যাকে মারা হয়েছে, আমার ধারণা সে ভবঘুরে ছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল শারীরিকভাবেও সে খুব একটা সুস্থ-সবল ছিল না। এ ছাড়া বাচ্চাটিও তার জায়গায় আছে। কালকেও আমরা দেখেছি, আজ সকালেও দেখেছি। কারা মব তৈরি করে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। 

তিনি বলেন, ঘটনাটি রাতে ঘটেছে। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই এসেছে। আমাদের নিরাপত্তাকর্মীরাও গেছে। পুলিশ সকাল থেকেই তদন্ত করছে। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করার, তা করা হয়েছে। 

গোলাম সারওয়ার (মুন) আরও বলেন, কিছু মানুষ মব তৈরি করে এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। কথায় কথায় মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। আগে-পিছে কী ঘটনা, এসব না জেনেই মানুষ একজন আরেকজনকে মারছে। ফলে যে মারা গেল, সেও জানল না কেন তাকে মারা হলো। আর যে মারছে, সেও জানে না কেন মারছে। এখানেও এটাই হয়েছে।

শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম খোলা কাগজকে জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফুটেজ পর্যালোচনা করে হামলায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার মো. মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে অয়ন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার উত্তর রাজাপুর এলাকার জাকির হোসেন ও শাহনাজের ছেলে। তিনি রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার সেনপাড়া পর্বতে বসবাস করতেন।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  আইন লঙ্ঘন   প্রাণহানি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close