শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬,
৭ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ৪৩০ রানের পাহাড় গিলে ইংল্যান্ডকে কাঁদাল লঙ্কানরা      ● দাম্মাম ও রিয়াদগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্থগিত       ● পিএইচপির ত্রুটির পর হ্যাকিংয়ের চেষ্টা কয়েক লাখ ছাড়াল      ● প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে কূটনীতিতে নতুন মোড়      ● ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৫১২      ● সাজেকে অবরোধকারীদের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ৯ সদস্য আহত      ● সাজেকে ইউপিডিএফ ৩০-৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে : আইএসপিআর      
খোলাকাগজ স্পেশাল
আধিপত্যে জিম্মি জনজীবন
চট্টগ্রাম ব্যুরো ও রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের গঙ্গারাম বাজার ও উজোবাজার এলাকায় অবরোধ সরানোকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন সদস্য এবং পুলিশের দুই সদস্যসহ অন্তত ছয়জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব। বেড়াতে গিয়ে অবরোধের মুখে পড়া পর্যটকদের কাছে এবারের ভ্রমণ পরিণত হয় আতঙ্কের অভিজ্ঞতায়। 

এ ছাড়া অবরোধে সশস্ত্র সদস্যরা ভয়ভীতি দেখিয়ে স্থানীয় জনগণকে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করেন এবং তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন বলে জানা গেছে। এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। 

এদিকে, সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে প্রায় তিন হাজার পর্যটককে শেষ পর্যন্ত খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সাজেক সড়কে তৃতীয় দফা আন্দোলনের ডাক দেয় সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠন দুটি প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সমর্থিত বলে জানান বাঘাইছড়ি সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক। 

সাজেক পর্যটন সড়কের ১০ নম্বর এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে সকাল থেকেই সড়ক অবরোধ করে। এতে আটকা পড়ে প্রায় ২৯৩৩ পর্যটক। সকালে পর্যটকরা ফেরার পথে উজো বাজারে আটকে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যারিকেড সরিয়ে পর্যটকদের নিয়ে আসার চেষ্টা করলে পর্যটকদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট ও গুলি করে আন্দোলনকারীরা। পাল্টা গুলি ছুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টাব্যাপী চলে গোলাগুলি। এতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ৬ সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে কোনো পর্যটক আহত হননি। 

অবরোধ সরাতে গিয়ে গুলি, আতঙ্কে পর্যটকেরা: 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে চলা অবরোধের কারণে সাজেকে আটকা পড়েন প্রায় তিন হাজার পর্যটক। বৃহস্পতিবার সকালে সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তায় তাদের খাগড়াছড়ির উদ্দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পর্যটকবাহী গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। পথে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধের মুখে পড়ে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সাজেকে বেড়াতে গিয়ে অবরোধের মুখে পড়া পর্যটকদের কাছে এবারের ভ্রমণ পরিণত হয় আতঙ্কের অভিজ্ঞতায়। হবিগঞ্জ থেকে বেড়াতে আসা অপু জানান, আনন্দ করতে গিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। অবরোধের কারণে সাজেক ঠিকমতো ঘুরে দেখার সুযোগ হয়নি। সন্ধ্যা থেকে আন্দোলন ও উত্তেজনার খবর শুনে নিরাপদে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

পর্যটকরা জানান, সকাল থেকেই উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলাম। দুপুর পর্যন্ত না খেয়েই ছিলাম। সেনাবাহিনী স্কট দিয়ে নিরাপদে নিয়ে আসেন। পথিমধ্যে চার জায়গায় আমাদের আটকানো হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকাতে আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। উজোবাজার এসে আমাদের উপর ইট ও গুলি ছুড়েছে। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত হাতে তাদের প্রতিহত করেছেন। কোন পর্যটক আহত হয়নি বলে তারা জানায়।

পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি, ঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ

পাহাড়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের বিরোধ, আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এবং সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু এসব বিরোধের জেরে যখন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তখন তার মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপাকে পড়েন পর্যটক, পরিবহনশ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। 

মানবঢাল হিসেবে স্থানীয়দের ব্যবহারের অভিযোগ: 

ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা ভয়ভীতি দেখিয়ে স্থানীয় জনগণকে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করেন এবং তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন।প্রাথমিক মূল্যায়নে অবরোধ ও সহিংসতাকে পূর্বপরিকল্পিত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে আইএসপিআর। সংস্থাটির ভাষ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ কোণঠাসা হয়ে পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। 

আধিপত্যের দ্বন্দ্বে অবরুদ্ধ পাহাড়: 

পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বিরোধের জেরেই সাজেক সড়কে অবরোধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইউপিডিএফ-সমর্থিত সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন অবরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে জেএসএসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংগঠনটির রাঙামাটি জেলা সভাপতি গঙ্গামানিক চাকমা। তার দাবি, এসব ইউপিডিএফের ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচার। সাজেকে ইউপিডিএফের তৎপরতা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তৎপরতা ও জনগণের ওপর শোষণ-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। তবে সাজেকের বৃহস্পতিবারের গোলাগুলিতে জেএসএসের সংশ্লিষ্টতার কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

আন্দোলনকারীরা জানান, শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ কর্মসূচি চলছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জোর করে সরিয়ে দেয়। তিন দফা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে জানান আন্দোলনকারীরা।

মূলত জেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

অংগ্য মারমা শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের উপর বর্বর হামলা, লাঠিচার্জ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও নিন্দা জানান। তিনি অবিলম্বে সাজেকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে উক্ত এলাকা থেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা: 

অবরোধের কারণে পর্যটক আটকে পড়া এবং গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়ায় সাজেকসহ এ অঞ্চলে পর্যটন ব্যবসায় ধস নামবে বলে আশঙ্কা করছে ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভবিষ্যতে ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করতে পারেন। বুকিং কমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রিসোর্টমালিক, গাড়িচালক, পর্যটকবাহী পরিবহনের কর্মী এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে উজোবাজারে অবরোধকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় অবরোধকারীরা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে সেনাবাহিনীর তিন থেকে চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হন।

পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলে বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থেমে থেমে প্রায় দুই ঘণ্টা গুলিবিনিময় হয়।

পুলিশ সুপার আরও জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং উজোবাজারের নিয়ন্ত্রণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রয়েছে। এছাড়া সব পর্যটক নিরাপদে সাজেক ছেড়েছেন। তিনি বলেন, পুরো ঘটনা তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকে পর্যটক ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী।

এদিকে,  রাঙ্গামাটির সাজেকে সড়ক অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ এনে আগামী শনিবার রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল  বৃহস্পতিবার বিকেলে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এ কর্মসূচি ঘোষণা করে। 

প্রসঙ্গত, তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারী অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। 

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  আধিপত্য   জিম্মি   জনজীবন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close