মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● বাংলাদেশ-জাপান বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে চান তারেক রহমান      ● টোকিওতে তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা তাকাইচির      ● সীতাকুণ্ডে লরিচাপায় শিশুসহ নিহত ৫      ● বাংলাদেশে ৬৩৫ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্যোগ জাপানের      ● ক্রসফায়ার বলতে বিচারবহির্ভূত হত্যা বোঝাননি আইজিপি : পুলিশ সদরদপ্তর      ● অতি প্রবল হয়ে উঠছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব, গতিবেগ হতে পারে ১২০-১৪০ কিমি      ● রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগ      
ফিচার
সন্তান ধারণের প্রযুক্তি: সম্ভাবনা, বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত পছন্দ
খোলা কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

নতুন প্রজনন প্রযুক্তি (এনআরটি) সন্তান ধারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু আমাদের সমাজে সন্তান নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা কতটা ব্যক্তিগত, আর কতটা পরিবার ও সামাজিক প্রত্যাশার দ্বারা প্রভাবিত?

সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তকে সাধারণত দম্পতির একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে, জীবনের কোন পর্যায়ে সন্তান নেওয়া হবে, প্রজননগত জটিলতা দেখা দিলে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিংবা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়তা নেওয়া হবে কি না—এসব সিদ্ধান্ত সব সময় কেবল দম্পতির নিজস্ব ইচ্ছায় নির্ধারিত হয় না। পরিবার, আত্মীয়স্বজনের প্রত্যাশা, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এসব সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো সামাজিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে বিয়ে ও সন্তান জন্মদানকে প্রায়ই বিবাহিত জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানে সন্তানহীনতা কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা চিকিৎসাগত সীমাবদ্ধতার বিষয় থাকে না। এটি পারিবারিক সম্পর্ক, বংশরক্ষা এবং ব্যক্তির সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে।

বিয়ের কয়েক বছর পার হলেই অনেক দম্পতিকে শুনতে হয়, ‘খবর কী?’ আত্মীয়ের বাসা, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রের আড্ডায় এমন প্রশ্ন তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে আলোচনার বিষয় করে তোলে। নতুন প্রজনন প্রযুক্তি সন্তান ধারণের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে, কিন্তু সিদ্ধান্তের ওপর সামাজিক চাপ কমিয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সন্তান নেওয়ার স্বাধীনতা কতটা স্বাধীন?

নতুন প্রজনন প্রযুক্তির (এনআরটি) মধ্যে রয়েছে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ), শুক্রাণু ও ডিম্বাণু দান এবং সারোগেসির মতো পদ্ধতি। এসব প্রযুক্তি সন্তান ধারণে বাধা বা জটিলতার মুখোমুখি হওয়া অনেক দম্পতির সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতি শুধু চিকিৎসাগত সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এসব প্রযুক্তি গ্রহণের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার সম্পর্ক, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পরিবার ও আত্মীয়তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার যোগসূত্র রয়েছে।

সন্তান না থাকার অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কেউ স্বেচ্ছায় সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, কেউ ক্যারিয়ার বা জীবনের অন্যান্য অগ্রাধিকার বিবেচনায় সন্তান নেওয়ার সময় পিছিয়ে দেন। আবার কেউ সন্তান পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও জৈবিক বা প্রজননসংক্রান্ত জটিলতার মুখোমুখি হন। এসব ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে একইভাবে বিচার করলে ব্যক্তিগত পছন্দ ও বাস্তবতার বৈচিত্র্য উপেক্ষিত হয়।

তবে যে সমাজে সন্তান জন্মদানকে বিবাহিত জীবনের পূর্ণতা বা অপরিহার্য পরিণতি হিসেবে দেখা হয়, সেখানে সন্তান না থাকার বিষয়টি দম্পতির ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে যায়। আত্মীয়স্বজনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন, পরিবারের প্রত্যাশা কিংবা দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে বাইরের মানুষের অনুমান তাঁদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রজনন চিকিৎসা নেওয়ার পেছনে শুধু সন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশাও ভূমিকা রাখতে পারে।

নৃবিজ্ঞানে সন্তান জন্মদানকে সামাজিকভাবে উৎসাহিত ও প্রত্যাশিত আচরণ হিসেবে দেখার প্রবণতাকে বলা হয় ‘প্রোনাটালিজম’। এই ধারণায় সন্তান জন্মদানকে কেবল ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, বরং পারিবারিক পূর্ণতা, বংশরক্ষা ও সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে সামাজিক চাপ থাকলেই কারও সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা অনিচ্ছাকৃত বা আরোপিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একজন মানুষ নিজের ইচ্ছায় সন্তান চাইতে পারেন, একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপও অনুভব করতে পারেন।

প্রজননের দায় কেন নারীর শরীরে কেন্দ্রীভূত হয়?

প্রজননসংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে দম্পতির উভয়েরই চিকিৎসাগত মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সামাজিক আলোচনায় অনেক সময় নারীর শরীরকেই সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নারীর বয়স, মাসিক, গর্ভধারণের সক্ষমতা কিংবা মাতৃত্বের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই পার্থক্য কতটা এবং কোন পরিস্থিতিতে দেখা যায়, তা নির্দিষ্ট গবেষণা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। নারীবাদী নৃবিজ্ঞান দেখায়, শরীরের অভিজ্ঞতা শুধু জৈবিক বিষয় নয়; সামাজিক মূল্যবোধও সেই অভিজ্ঞতার অর্থ নির্ধারণ করে।

মাতৃত্বকে নারীর পরিচয়ের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হলে গর্ভধারণে অসুবিধা তাঁর কাছে চিকিৎসাগত সমস্যার পাশাপাশি আত্মপরিচয় ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসা নেওয়ার চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের দায় এবং নিজের শরীর নিয়ে অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে।

আইভিএফের মতো চিকিৎসায় হরমোন প্রয়োগ, বিভিন্ন পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এসব প্রক্রিয়ার চিকিৎসাগত উদ্দেশ্য থাকলেও তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবন, আবেগ, সময় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে। চিকিৎসার সাফল্য নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ব্যর্থ প্রচেষ্টা, মানসিক চাপ এবং চিকিৎসা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে দার্শনিক মিশেল ফুকোর ‘বায়োপাওয়ার’ বা জৈব-ক্ষমতার ধারণা প্রাসঙ্গিক। এই ধারণা ব্যাখ্যা করে, শরীর, স্বাস্থ্য, জন্ম ও জনসংখ্যা কীভাবে সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। প্রজনন চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন ওঠে—কোন ধরনের শরীরকে চিকিৎসার উপযোগী বিবেচনা করা হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার মতামত বেশি গুরুত্ব পায় এবং সন্তান জন্মদানের সাফল্য কীভাবে সংজ্ঞায়িত হয়?

এর অর্থ এই নয় যে চিকিৎসকের পরামর্শ বা প্রজনন প্রযুক্তি নিজেই নিপীড়নের সমার্থক। এসব প্রযুক্তি মানুষের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে; আবার সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কারও ওপর বাড়তি চাপও তৈরি করতে পারে। দুই দিকই বিবেচনায় রাখা জরুরি।

চিকিৎসার সুযোগ, ব্যয় ও বৈষম্য

প্রজনন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই চিকিৎসাগত সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এই চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ সবার সমান কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

চিকিৎসার ব্যয়, চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতায়াত, একাধিকবার চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার সক্ষমতা—এসব বিষয় দম্পতির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য বেশি, তাঁরা চিকিৎসার বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনার তুলনামূলক বেশি সুযোগ পেতে পারেন। অন্যদিকে, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কারও পক্ষে চিকিৎসা শুরু করা, চালিয়ে যাওয়া কিংবা একাধিক প্রচেষ্টার ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে।

ফলে প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও বাস্তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ শ্রেণিভেদে আলাদা হতে পারে। বাংলাদেশের প্রজনন চিকিৎসার প্রকৃত ব্যয় ও প্রবেশাধিকারের পার্থক্য নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য স্থানীয় তথ্য প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া বৈষম্যের মাত্রা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।

এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। এটি জানতে চায়, চিকিৎসার ব্যয় কে বহন করছেন, প্রযুক্তির সুযোগ কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে এবং কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসাকে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখলে বৃহত্তর কাঠামোগত বৈষম্যগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে।

গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রজনন চিকিৎসা নিয়ে সামাজিক বিচার বা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের আশঙ্কায় কেউ নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে নীরব থাকতে বাধ্য হওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটি ব্যক্তির অধিকার; দ্বিতীয়টি তাঁর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত করতে পারে।

প্রযুক্তি কীভাবে আত্মীয়তার ধারণা বদলায়?

নৃবিজ্ঞানে আত্মীয়তা কেবল রক্তের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বীকৃতি, পারস্পরিক যত্ন, দায়িত্ব, উত্তরাধিকার, বিবাহ এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েও আত্মীয়তার ভিত্তি গড়ে ওঠে।

আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তি এই প্রচলিত ধারণার সামনে নতুন প্রশ্ন হাজির করেছে। আইভিএফের ক্ষেত্রে নিষেকের প্রক্রিয়া মানবদেহের বাইরে পরীক্ষাগারে সম্পন্ন হয়। আবার শুক্রাণু বা ডিম্বাণু দানের মাধ্যমে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে শিশুর জৈবিক উৎস, গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিকভাবে মা-বাবা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়গুলো একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

সারোগেসির ক্ষেত্রেও যিনি গর্ভধারণ করেন এবং যাঁরা পরবর্তী সময়ে অভিভাবক হিসেবে শিশুকে লালন-পালন করেন, তাঁদের ভূমিকা আলাদা হতে পারে। ফলে মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের ধারণা নতুনভাবে বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দেয়।

নৃবিজ্ঞানী সারা ফ্র্যাঙ্কলিনের আইভিএফ-বিষয়ক গবেষণা দেখায়, প্রজনন প্রযুক্তি কেবল সন্তান জন্মদানের চিকিৎসাগত সহায়তা নয়; এটি প্রজনন ও আত্মীয়তা সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করে (Franklin, 2013)।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মা-বাবা বা আত্মীয় হওয়ার ভিত্তি কি শুধু জৈবিক সম্পর্ক, নাকি যত্ন, নৈতিক দায়িত্ব এবং সামাজিক স্বীকৃতিও এই পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে?

গবেষক মার্সিয়া সি. ইনহর্নের (২০১২) কাজেও প্রজনন প্রযুক্তির সঙ্গে পুরুষত্ব ও পিতৃত্বের সম্পর্ক গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম সমাজ নিয়ে তাঁর আলোচনা দেখায়, পুরুষের বন্ধ্যত্ব কেবল চিকিৎসাগত সমস্যা নয়; এটি প্রচলিত পুরুষত্বের ধারণা এবং বংশপরিচয় বজায় রাখার সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশেষ করে শুক্রাণু দানের প্রশ্নটি পিতৃত্ব, সন্তানের বংশপরিচয় এবং ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করে।

বাংলাদেশের মতো সমাজে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং প্রজনন প্রযুক্তি ব্যবহারকারী মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো একটি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক অবস্থানকে একক ও অপরিবর্তনীয় হিসেবে ধরে নেওয়া বস্তুনিষ্ঠ হবে না। একইভাবে, প্রযুক্তিগতভাবে কোনো পদ্ধতি সম্ভব হলেই তা সর্বত্র সামাজিক, নৈতিক ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

বাংলাদেশে তৃতীয় পক্ষের দাতার পরিচয়, সন্তানের আইনি অধিকার ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর প্রয়োগ এবং সম্ভাব্য অস্পষ্টতা নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, নীতিমালা ও প্রজনন প্রযুক্তির নতুন বাস্তবতার সম্পর্ক সতর্কভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

প্রযুক্তির কেন্দ্রে থাকা উচিত মানুষের সিদ্ধান্ত

নতুন প্রজনন প্রযুক্তিকে একদিকে নিঃশর্ত মুক্তি, অন্যদিকে নিছক শোষণ হিসেবে দেখলে এর জটিলতা বোঝা কঠিন। এসব প্রযুক্তি অনেকের জন্য সন্তান ধারণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক চাপ, লিঙ্গভিত্তিক দায়িত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তাঁদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব এখানেই। এটি শুধু প্রযুক্তি কী করতে পারে, তা জানতে চায় না; বরং প্রযুক্তি মানুষের জীবনে কী অর্থ তৈরি করে, কারা এর সুযোগ পান, কারা এর ব্যয় বহন করেন এবং কোন সামাজিক মূল্যবোধ এর ব্যবহারকে প্রভাবিত করে, সেসব প্রশ্নও সামনে আনে।

বাংলাদেশে প্রজনন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা তাই শুধু চিকিৎসার সাফল্য কিংবা সন্তান জন্মদানের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সন্তান না নেওয়ার অধিকার, চিকিৎসা বন্ধ করার স্বাধীনতা, পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, সাশ্রয়ী চিকিৎসার সুযোগ এবং পরিবার গঠনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতি সম্মান—এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রজনন চিকিৎসায় স্বাধীন ও সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা, চিকিৎসার ব্যয় ও সুযোগের বৈষম্য কমানো, প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা এবং নারী-পুরুষ উভয়ের প্রজননস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বিবেচনা করা যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু প্রজনন প্রযুক্তি গ্রহণ করা উচিত কি না, তা নয়; বরং মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা যেমন সম্মান পাওয়ার যোগ্য, তেমনি সন্তান না নেওয়া, চিকিৎসা না করানো কিংবা চিকিৎসার কোনো পর্যায়ে থেমে যাওয়ার সিদ্ধান্তও সম্মান পাওয়ার যোগ্য। প্রজনন প্রযুক্তির অগ্রগতিকে মানুষের স্বাধীনতা বৃদ্ধির অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করতে হলে সেই স্বাধীনতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক শর্তগুলোও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিবন্ধকার

সাদিয়া আলম ঐশী, সালমান রহমান সামি, সাবরিনা হোসেন, রাযীন সালেহ বিয়াশ ও জেরিনসুলতানা

নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ২০তম আবর্তন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা


কেকে/সাশ 


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

ফিচার- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close