দেশের পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের মহাসড়কে নতুন এক মাইলফলক যোগ হতে চলেছে। সিলেট অঞ্চলে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছে কার্পাস তুলা চাষ।
চা ও লেবুর রাজ্য হিসেবে পরিচিত পর্যটন নগরী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পরীক্ষামূলক চাষেই মিলেছে তাক লাগানো বাম্পার ফলন। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নিবিড় পরিচর্যা ও উপযুক্ত আবহাওয়ায় এই অর্জনে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বইছে আনন্দের জোয়ার, যা গোটা অঞ্চলে কৃষিবিপ্লবের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
শ্রীমঙ্গলে প্রথম বাণিজ্যিক সাফল্য :
উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের সাইটুলা গ্রামের উদীয়মান কৃষক তাপস কুমার কুর্মী (৪০) চলতি বছরের জুলাই মাসে প্রায় সাড়ে চার কেয়ার (প্রায় ১৫ শতক প্রতি কেয়ার) জমিতে উচ্চফলনশীল জাতের ‘সিবি হাইব্রিড-১’ তুলার বীজ রোপণ করেন। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে খেতজুড়ে এখন সবুজ পাতার ফাঁকে থোকা থোকা গোলাপী ও সাদা রঙের তুলাফুল ঝুলছে, যা দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদেরও নজর কাড়ছে।
কৃষক তাপস কুমার কুর্মী দৈনিক খোলা কাগজকে জানান, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ রোপণ ও পরিচর্যা পর্যন্ত তার মোট খরচ হয়েছে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সাড়ে চার কেয়ার জমি থেকে প্রায় ৬০ মণ তুলা সংগ্রহের আশা করছেন তিনি। প্রতি মণ তুলা ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করলে সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকার তুলা বিক্রির প্রত্যাশা তার।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা মো. মাসুকুর রহমান বলেন, প্রাথমিক হিসেবে আমরা প্রায় ৬০ মণ ফলন আশা করছি। তুলা চাষের পরিধি বাড়াতে নতুন জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভাগীয় সহযোগিতায় এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
আমদানিনির্ভরতা কমাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ লাখ বেল উৎপাদনের লক্ষ্য :
তুলা উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৮৫ লাখ বেল তুলার চাহিদা রয়েছে, যার বিপরীতে উৎপাদিত হয় মাত্র ২ লাখ বেল। বাকি তুলা আমদানিতে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যায়। এই বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ লাখ বেল তুলা উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড।
এ বিষয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক মো. কুতুব উদ্দীন দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমরা যদি দেশে ১ কেজি তুলাও উৎপাদন করতে পারি, তবে প্রায় ৩ ডলার সাশ্রয় হয়। আমাদের ১৬ লাখ বেল তুলার মৌলিক চাহিদা পূরণে এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা নিরলস কাজ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলে প্রচুর পতিত জমি থাকায় মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার উঁচু জমিগুলোকে টার্গেট করে একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলে ছয়-সাতটি নতুন অফিস স্থাপন এবং চলতি বছরই সিলেটে একটি নিজস্ব ইউনিট অফিস চালু করা সম্ভব হবে।’
দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সফল রূপায়ণ :
এর আগে সিলেট বিভাগে তুলা চাষের একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা প্রতিকূলতায় তা থমকে গিয়েছিল। তবে এবার শ্রীমঙ্গলে সেই ধারণার সফল পতন ঘটেছে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ঢাকা স্টোর কাম ফিল্ডম্যান ও শ্রীমঙ্গল এরিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শুক দেব রায় খোলা কাগজকে বলেন, ‘শুরুতে অতিবৃষ্টির বাধাকে পেরিয়ে বর্তমানে প্রায় ৫ বিঘার মতো জমিতে সুস্থ-সবল তুলা দাঁড়িয়ে আছে। কৃষকদের এই অদম্য আগ্রহ দেখে আমরা আগামীতে প্রায় ৩০০ বিঘা জমিতে তুলা চাষের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘কৃষি বিভাগ ও তুলা উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ প্রচেষ্টায় চলতি মৌসুমে আশানুরূপ ফলন পাওয়া গেছে। শ্রীমঙ্গল তথা এই অঞ্চলের জন্য তুলা এখন একটি অত্যন্ত লাভজনক ও সম্ভাবনাময় ফসল।’
‘সিবি হাইব্রিড-১’ চাষের মূল বৈশিষ্ট্য :
উচ্চফলনশীল এই জাতের বিশুদ্ধতার হার ৯৮ শতাংশ এবং অঙ্কুরোদগম হার ৭০ শতাংশের বেশি। ১৭০-১৮০ দিন জীবনকালের প্রতিটি তুলার বলের ওজন ৫-৬ গ্রাম হয়ে থাকে।
রোপণের উপযুক্ত সময় :
১৬ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট (শ্রাবণ মাস) বীজ বা চারা রোপণের শ্রেষ্ঠ সময়।
মাটি ও পরিচর্যা :
পানি জমে না এমন উঁচু দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি উপযোগী এবং প্রথম ৬০-৭০ দিন খেত আগাছামুক্ত রাখতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রণোদনা ও তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ধারাবাহিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে মৌলভীবাজারের উঁচু পতিত জমিতে কার্পাস তুলার ব্যাপক বিস্তার ঘটবে। এটি কেবল স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্যই বদলাবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ করবে এক নতুন শক্ত ভিত।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় উঁচু জমিতে তুলা চাষের এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সিলেট অঞ্চলে তুলা চাষ বিপ্লব ঘটাতে পারে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেকে/এআই