সংসারে অভাব, কাঁধে পরিবারের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়নি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের শাকিল তালুকদারের (২৯)। এইচএসসি পাসের পরই নামতে হয় উপার্জনের লড়াইয়ে। তবে প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রমকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছেন খামার। দুটি গাভি ও ছয়টি ছাগল নিয়ে শুরু করা তার উদ্যোগ এখন বিস্তৃত হয়েছে গবাদিপশু পালন, মাছ চাষ ও কৃষিতে। বর্তমানে তার খামারে কাজ করছেন ১২ জন শ্রমিক। শাকিলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে একই গ্রামের প্রায় ৪০ জন তরুণও কৃষি ও খামারভিত্তিক কাজে যুক্ত হয়েছেন।
শাকিল ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে এইচএসসি পাসের পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা, সংসারের খরচ এবং ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তাকে উপার্জনের পথ খুঁজতে হয়। তার মেজ ভাই একটি দোকানে কাজ করেন।
পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে শাকিল উপলব্ধি করেন, স্বাবলম্বী হতে হলে নিজেকেই কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে হবে। সেই চিন্তা থেকে ২০২১ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও গবাদিপশু পালনের প্রশিক্ষণ নেন। পরে ২০২৩ সালে একই অধিদপ্তর থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যুব ঋণসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে শুরু করেন গবাদিপশু পালন।
প্রাথমিক পর্যায়ে তার খামারে ছিল দুটি গাভি ও ছয়টি ছাগল। গাভির দুধ বিক্রি করে যে অর্থ আয় হতো, তা আবার খামারের উন্নয়নে বিনিয়োগ করতেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর উদ্যোগের পরিসর। বর্তমানে খামারে রয়েছে ১২টি গাভি ও ১০টি ছাগল।
পশুপালনের পাশাপাশি কৃষি ও মাছ চাষেও যুক্ত হয়েছেন শাকিল। প্রায় তিন একর জমিতে আখ, মরিচ, টমেটো, ধান, ওলকচু, লাউ, মিষ্টিকুমড়া ও লতিরাজ কচুসহ বিভিন্ন ফসল ও শাকসবজি চাষ করছেন। এ ছাড়া দুটি পুকুরে করছেন মাছের চাষ। সব মিলিয়ে তার উদ্যোগে বর্তমানে ১২ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
শাকিলের সাফল্য শুধু তার নিজের পরিবারের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনেনি, গ্রামের অন্য তরুণদেরও নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। তাকে দেখে কেউ সবজি চাষে, কেউ মাছ চাষে আগ্রহী হয়েছেন। আবার কেউ কৃষিকে কেন্দ্র করে নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এভাবে তাঁর সাফল্য অনুসরণ করে গ্রামের প্রায় ৪০ জন তরুণ কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছেন।
নাজিরপুর গ্রামের মো. কবির হোসেন, আব্দুল গফুর ও শহীদ আলী বলেন, শাকিলের কাজ দেখে তারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তার পরিকল্পনা ও কাজের ধরন অনুসরণ করে নিজেরাও সবজি ও মাছ চাষ শুরু করেছেন। তাদের ভাষ্য, শাকিলকে দেখে তারা বুঝেছেন, চেষ্টা ও পরিশ্রম থাকলে গ্রামেও স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। তিনি গ্রামের একজন সফল উদ্যোক্তা, যা তাদের গর্বিত করে।
কৃষি ও খামার পরিচালনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত শাকিল। তিনি আলমপুর ইউনিয়ন আনসার ও ভিডিপির দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আনসার সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও অংশ নেন। নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি সমাজের মানুষের জন্য কাজ করেও আত্মতৃপ্তি পান তিনি।
শাকিলের সাফল্যের পেছনে প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রমের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন জেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, শাকিল অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন যুবক। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগিয়ে তিনি সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার আরও উন্নতি কামনা করেন এই কর্মকর্তা।
শাকিলের পথচলা দেখাচ্ছে, কর্মসংস্থানের জন্য শুধু চাকরির অপেক্ষায় না থেকে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে নিজেও উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ধৈর্য। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে দুটি গাভি থেকে শুরু করা তার উদ্যোগ আজ নিজের পরিবারের জীবিকার অবলম্বন হওয়ার পাশাপাশি গ্রামের অন্য তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
কেকে/সাশ