বাংলাদেশের দক্ষিণ অংশে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম জোয়ারধৌত গরান বনভূমি। নানা ধরনের গাছপালার চমৎকার সমারোহ ও বিন্যাস এবং বন্যপ্রাণীর সমাবেশ এ বনভূমিকে করেছে আরও আকর্ষণীয়। আজ থেকে প্রায় দুই শত বছর আগেও এ বনভূমির এলাকা ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বের অধিকাংশ বনভূমির অবস্থা আজ অস্তিত্ব সংকটে। মানুষের লোভের শিকার ও প্রাকৃতিক কিছু কারণে আমাদের সুন্দরবনও আয়তন হারাচ্ছে। বর্তমানে নানা কারণে ছোট হতে হতে প্রকৃত আয়তনের এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশ দুই ভাগে ভাগ হলে সুন্দরবনের দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের এবং বাকিটা ভারতের অংশে পড়েছে। বাংলাদেশের ভাগের আয়তন প্রায় বর্গকিলোমিটার। ১৮৭৫ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ বনভূমির প্রায় ৩২৪০০ হেক্টর এলাকাকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সুন্দরবনের নাম ঠিক কি কারণে সুন্দরবন হলো তা একেবারে স্পষ্ট বলা যায় না তবে প্রচলিত এবং গ্রহণযোগ্য মত যে এই বনের সুন্দরী বৃক্ষের নাম থেকেই করা হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে সুন্দরী গাছ ছিল বনের এক লাখ ৬৬ হাজার ৬৪৫ হেক্টরজুড়ে। ২০১৪ সালে তা কমে গিয়ে এক লাখ ১২ হাজার ৯৯৫ হেক্টর হয়।
তথ্যে জানা যায়, ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্বাধিকার অর্জন করে। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবন এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। (সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সুন্দরবনের বন্য প্রাণী, বায়ু, মাটি, পানি ও বৃক্ষসম্পদ নিয়ে ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক বহুমাত্রিক গবেষণা থেকে জানা যায় সুন্দরবনে প্রতি ১০টি সুন্দরীগাছের মধ্যে ৪টি (৩৯ শতাংশ) আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত। এখন আক্রান্ত সুন্দরীগাছের সংখ্যা ১২ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত সুন্দরীগাছের সংখ্যা ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার। ষোড়শ শতাব্দীতে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরি বইয়ে কুষ্টিয়া ও যশোর পর্যন্ত। তবে বিভিন্ন কারণে সুন্দরবন তার অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে রয়েছে।
পর্যটন, প্লাস্টিকের দূষণ, বনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল ও পণ্যবাহী জাহাজডুবির ভয়াবহ প্রভাবও পড়ছে। থেমে নেই বিষ দিয়ে মাছ ধরা, মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, গাছ কাটা, আগুন দেয়া ও বন্যপ্রাণী শিকার। সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বনের নদী, মাটি, গাছপালা ও প্রাণীর ওপর। সরকার সুন্দরবনের ৫২ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য ও চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকা প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
গবেষণায় জানা যায়, সুন্দরবনে সুন্দরীগাছের সংখ্যা এখন প্রায় ৩৩ কোটি। প্রাকৃতিকভাবে হেক্টরপ্রতি চারা জন্মানোর হারও কমেছে বিশ্বের বৃহৎ এ ম্যানগ্রোভ বনে। এ কারণে সুন্দরবনের কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমেছে ১৫ শতাংশ। গবেষকদের আশঙ্কা, সুন্দরবনের আচ্ছাদন, কার্বন সঞ্চয় করার সক্ষমতা, বন্য প্রাণীর আবাস ও বিন্যাস বদলে যেতে পারে। কারণ, আগামরা রোগ হলে প্রথমে সুন্দরীগাছের পাতা আক্রান্ত হয়। এরপর ডালপালা ও শাখা-প্রশাখা শুকিয়ে গাছের মূলকাণ্ড ধ্বংস হয়ে যায়। গবেষণায় সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ এ বৃক্ষের দুর্দশার পেছনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, পলিপতন, জোয়ার-ভাটায় পরিবর্তন আসা ও জলবায়ুর পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুন্দরবনে বছরে কত টন প্লাস্টিক জমা হয়, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব বা গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১৭ সালে ‘এনভায়রোনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা থেকে বছরে প্রায় ৭২ হাজার ৮৪৫ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর মডেলভিত্তিক তথ্য দেওয়া হয়। ২০২১ সালে ‘ফ্রনটিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সুন্দরবনবিষয়ক গবেষণাতেও ওই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সুন্দরবনে জমা হওয়া বর্জ্যরে পরিমাণ এবং জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ২০২০-২০২২ সালে সুন্দরবনের ছয়টি স্থানের নমুনায় প্রতি লিটার পানিতে গড়ে ২ দশমিক ২২টি এবং প্রতি কেজি মাটিতে ৭৩৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। এসব ক্ষতিকর উপাদান প্রতিনিয়ত সুন্দরবন ধ্বংস করছে। বনে বসবাসরত প্রাণীকুলের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে সুন্দরবন। এভাবে চলতে থাকলে প্রচুর গারবেজে পূর্ণ হয়ে যাবে সুন্দরবন।
এ বনে প্রচুর সুন্দরী গাছ দেখতে পাওয়া যায়। গাছপালা, প্রাণীকুল, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী, মাছ ইত্যাদি মিলিয়ে সুন্দরবন আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার। এ বনভূমির বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ পশ্চিম এলাকার লবণাক্ত পানির গেওয়া, গরান, কেওড়া, ওড়া, পশুর, ধুন্দুল, বাইন ইত্যাদি। দক্ষিণ অংশের অধিকাংশ এলাকা পরিমিত লবণাক্ত পানির বনে ঢাকা, আর প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরী। ঘনভাবে জন্মাতে দেখা যায় গোলপাতা। যার ছাউনি দিয়ে ঘর নির্মাণ করা যায়। পশুর, হরিণঘাটা এবং বুড়িশ্বর নদী দিয়ে প্রবাহিত প্রচুর স্বাদুপানি লবণাক্ততা কিছুটা হ্রাস করে পার্শ্ববর্তী এলাকায় সহনীয় স্বাদুপানির বন এলাকা গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে।
সুন্দরবনের প্রাণীকুলের কথা আসলে প্রথমেই আসে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা। তবে কেবল রয়েল বেঙ্গল টাইগারই নয় বরং আরও অনেক প্রাণীকুলের আবাসস্থল এই সুন্দরবন। এ বনভূমিতে আছে প্রায় ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী (উল্লেখযোগ্য চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, রেসাস বানর, বনবিড়াল, লিওপার্ড, সজারু, উদ এবং বন্য শুকুর), ৩২০ প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি বক, সারস, কাঁদাখোচা, হাড়গিলা, লেনজা, গাংচিল, জলকবুতর, টার্ন, চিল, ইগল, শকুনসহ দেশি প্রজাতির পাখি, প্রায় ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ (গুইসাপ, কচ্ছপ ও নানা প্রজাতির সাপ), ৮ প্রজাতির উভচর এবং প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ। এ বিশাল বন ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।
এ অর্থনীতির প্রথমেই রয়েছে চিংড়ি। যা সাদা সোনা নামে পরিচিত। প্রায় ২০ প্রজাতির চিংড়ির মধ্যে বাগদা চিংড়ি ও হরিণা চিংড়ি বাণিজ্যিকভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ। এ চিংড়ি চাষ এবং বাণিজ্যের সাথে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে রয়েছে। তাছাড়া সুন্দরবনকে ঘিরে একটি বিশাল অংশ মাছ ধরার সাথে জড়িত। এই মাছ ধরেই তাদের জীবন ও জীবিকা চলে। মাঝে মাঝে তারা বাঘের আক্রমণেরও শিকার হয়। তারপরেও এই সুন্দরবনই তাদের বেঁচে থাকার অন্যতম উৎস। অর্থনৈতিকভাবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার নাম মৌয়াল যারা এ বনের মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তার বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে ফুলের মৌসুমে তিন-চার মাস বন থেকে মধু সংগ্রহ করে। এই মধু পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। আমাদের অর্থনীতিরও একটি বড়ো খাত এই সুন্দরবন। শুধু পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেই এখান থেকে বিপুল আয় করা সম্ভব।
শিকারিদের লোভের শিকার হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, শুকুরসহ নানা প্রাণী। এতে বনের খাদ্য শৃঙ্খলের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পরছে। বাঘ খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে প্রবেশ করে মানুষের হাতে মারা পরছে। অথচ এই বাঘের সংখ্যা কমতে কমতে আজ তা অস্তিত্ব হারানোর পথে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবন মহাগুরুত্বর্পূণ। বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকাতে গেলে বনায়ন বৃদ্ধি করতে হবে। এমনিতেই আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় বনভূমি নেই। কোন দেশের জন্য শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা আবশ্যক। আমাদের তা নেই। যেটুকু আছে তাও যদি আমরা ধ্বংস করে ফেলি তাহলে তা হবে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মত অবস্থা।
পর্যটন শিল্পেও এ বন গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর প্রচুর দেশি বিদেশি পর্যটক এ বন দেখতে যায়। সেক্ষেত্রে এটি আমাদের অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রেখে চলেছে। সুন্দরবন রক্ষায় সরকারি মহলকে আরও কঠোর ভূমিকায় অবর্তীণ হতে হবে। সুন্দরবনের আশেপাশে যারা বসবাস করে মূলত তারা এ বনের ওপর তাদের জীবন জীবিকা নির্ভর করে বেঁচে থাকে। তাদের যদি বিকল্প আয়ের পথ গড়ে তোলা যায় তাহলে তারা বনের কোন ক্ষতিসাধন করবে না। সুন্দরবনের ভেতর অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। বনের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল এবং সরঞ্জামাদি সরবরাহ করতে হবে। কারণ পাচারকারীরা শক্তিশালী এবং চতুর। তাই তাদের মোকাবেলা করার জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে- যারা কর্মঠ সৃজনশীল, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, সাহসী এবং বন রক্ষায় দৃঢ় সংকল্প হয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
কেকে/ এমএস