শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,
১৪ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● জাপানের শ্রমবাজারে ঢাকা কেন পিছিয়ে      ● চার দিনের জাপান সফর শেষে ঢাকার পথে প্রধানমন্ত্রী      ● এলপিজির কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব, বাড়তে পারে সিলিন্ডারের দাম      ● দুই ঘণ্টা পর মিরপুর-১০ ছাড়লেন পোশাকশ্রমিকেরা, যান চলাচল স্বাভাবিক      ● মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড      ● ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন : জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী বিএনপি প্রার্থী      ● তেল-গ্যাসে নাভিশ্বাস      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
রাজনীতি যখন মৃতের মর্যাদাও কেড়ে নেয়
সিয়াম সারোয়ার জামিল
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে। তিন নারী মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে গোপনে কবর খুঁড়ছেন। রাতের অন্ধকারে কোদাল হাতে তারা তৈরি করছেন একজন সদ্য মৃত পুরুষের শেষ আশ্রয়। দৃশ্যটি কেবল একটি পরিবারের শোকের ছবি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতি, সামাজিক সহনশীলতা এবং নাগরিকের মৌলিক মর্যাদা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলার মতো এক নির্মম বাস্তবতা। প্রতিহিংসার রাজনীতি কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, পিরোজপুরের শংকরপাশায় মানিক পশারীর দাফন ঘিরে ওঠা অভিযোগ সেই প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে। 

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক শীর্ষ নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মানিক পশারী। সেই সাক্ষ্যকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও মৃত্যুর পর তার পরিবারের সামনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংবাদে উঠে এসেছে, তিনি একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ করেননি-এমন অভিযোগে স্থানীয় জামায়াত সমর্থকরা রাষ্ট্রীয় সম্মান দিতে বাধা প্রদান করে। তাঁর মরদেহ দীর্ঘ সময় অ্যাম্বুলেন্সে পড়ে ছিল, পরিবারের সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে তাঁর মেয়ে ও দুই বোনকে কবর খুঁড়তে হয়েছে। 

অভিযোগগুলোর পূর্ণ সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিরোধ থাকলে তার শেষ বিদায় বাধাগ্রস্ত করার অধিকার কারও আছে কি? আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া কি ভবিষ্যতে প্রতিশোধের আশঙ্কা তৈরি করবে? আর রাষ্ট্র কি নাগরিকের মৃত্যুর পরও তাঁর মর্যাদা ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবে? তাহলে রাষ্ট্রের কাজ কী?

কবরের মাটি থেকে উঠে আসা প্রতিহিংসার রাজনীতি

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলা নামে একজন পীরের মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ‘ইমান ও আকিদা রক্ষা কমিটি’সহ বিভিন্ন ব্যানারে সংগঠিত মানুষের কর্মকাণ্ড এবং ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ভয়াবহতা প্রকাশ করেছিল। এক বছর না পেরোতেই পিরোজপুরের শংকরপাশায় মানিক পশারীর দাফন নিয়ে ওঠা অভিযোগ আবারও দেখাল, মৃত মানুষের মর্যাদাও সংঘাতমুক্ত নয়। 

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর সেটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পরে রাতে পরিবারের নারী সদস্যরা গ্রামের কয়েকজনের সহযোগিতায় আবার কবর খুঁড়ে দাফনের ব্যবস্থা করেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মারধর, জানাজায় অংশ নিতে বাধা এবং প্রশাসনের যথাযথ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। 

এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা শেখ আব্দুর রাজ্জাক অবশ্য দাবি করেছেন, মানিক পশারী মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন এবং তার দাফনে জামায়াতের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হয়নি। তার বক্তব্যও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা দরকার।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাল্টাপাল্টি বিতর্কের আড়ালে মূল প্রশ্নটি হারিয়ে যেতে পারে না: একজন মৃত ব্যক্তির দাফন নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা মীমাংসার দায়িত্ব কার? কারও সাক্ষ্য মিথ্যা বলে মনে হলে আদালতে তার প্রতিবাদ করার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা। কিন্তু কবর খোঁড়া, দাফনে বাধা দেওয়া কিংবা শোকাহত পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক বিরোধের বিচার রাজনৈতিক শক্তির হাতে ছেড়ে দিলে আইনের শাসন অর্থহীন হয়ে পড়ে।

সাক্ষ্য দেওয়ার অপরাধ, নাকি ন্যায়বিচারের সাহস?

মানিক পশারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি সামনে এনে তাঁর অতীতকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হলে সেটি আরও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া কোনো ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রতিশোধের বিষয় নয়; এটি বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ। সাক্ষীর বক্তব্যের সত্যতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করার দায়িত্ব আদালতের। সাক্ষ্য নিয়ে আপত্তি থাকলে আইনি প্রক্রিয়ায় তা মোকাবিলা করতে হবে, সামাজিক প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়। মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। 

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌকায় যোদ্ধাদের সুন্দরবন এলাকায় প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া-আসা কিংবা রসদ পৌঁছে দেওয়ার কাজে তিনি যুক্ত ছিলেন—এমন তথ্য স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে। শংকরপাশা ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বলেশ্বর নদ এবং সুন্দরবনসংলগ্ন ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে এ ধরনের যাতায়াতের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। 

এখানে মূল বিষয় তার পরিচয়ের বিতর্ক নয়, বরং একটি নীতিগত প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারেন, তাঁর বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের কারণে তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা, ধর্মীয় অধিকার কিংবা মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া যায় না। আজ একজন ব্যক্তি অতীতের কোনো মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে সামাজিক প্রতিহিংসার আশঙ্কায় থাকলে আগামীকাল অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিও একই ভয়ের মুখে পড়তে পারেন। 

চব্বিশের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অভিযোগে যাঁরা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁদের নিরাপত্তার প্রশ্নও তাই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও রাজনৈতিক শক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে যদি সাক্ষীর নিরাপত্তার মানদণ্ড বদলে যায়, তাহলে ন্যায়বিচারের ওপর মানুষের আস্থা টিকবে কীভাবে?

রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়, মানবিকতার জায়গাই বা কোথায়?

মানুষের মৃত্যুর পর জানাজা ও দাফন শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান এবং স্বজনদের শোক প্রকাশের মৌলিক অধিকার। বাবার মৃত্যুর পর মেয়ের যেখানে প্রার্থনায় বসার কথা, সেখানে তাঁকে যদি রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়তে হয়, তবে সেই দৃশ্য একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ভাইয়ের শেষ বিদায়ে পাশে থাকার কথা যে বোনদের, তাঁদের হাতে কোদাল তুলে নেওয়ার পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? স্থানীয়ভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল কেন? পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে থাকলে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলো না কেন? মরদেহ দীর্ঘ সময় অ্যাম্বুলেন্সে পড়ে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে দিতে হবে। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ পর্যালোচনা করে দায়ীদের শনাক্ত করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নতুন নয়। একসময় যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা একসময় ক্ষমতার বাইরে যায়। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিশোধের সংস্কৃতি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কখনো নিশ্চিত হবে না। একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার সংবিধান, নির্বাচন কিংবা উন্নয়ন দিয়ে নির্ধারিত হয় না; দুর্বল ও বিপন্ন মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তা দিয়েও নির্ধারিত হয়। 

মানিক পশারীর দাফন ঘিরে ওঠা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং সত্য প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদকে কেন্দ্র করে মৃত মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার প্রবণতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। কারণ, আজ যে পরিবারটি রাতের অন্ধকারে প্রিয়জনকে কবর দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে বেঁচে আছে, আগামীকাল অন্য কোনো পরিবারের ভাগ্যেও এমন পরিস্থিতি ঘটতে পারে।

রাজা যায়, রাজা আসে; মানুষের মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক শক্তিরই মানুষের শেষ বিদায়ের সম্মান কেড়ে নেওয়ার অধিকার নেই। যে সমাজে মৃত্যুর পরও প্রতিহিংসার ভয় কাটে না, সেখানে জীবিত মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত? আর যে রাষ্ট্র একজন নাগরিকের শেষ বিদায়ের মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতির অর্থই বা কী?

লেখক: গবেষক

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close