জুলাই অভ্যুত্থানের পর সংকটে পড়া অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর দায়িত্ব ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। প্রত্যাশা ছিল, ২০২৫ সাল হবে অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের বছর। কিন্তু বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রত্যাশা অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে। আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। নির্বাচনের আগে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার যে চিত্র আমরা দেখি তা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে নির্বাচন ঘিরে যখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক খাতগুলো সংস্কারের কথা থাকলেও কাক্সিক্ষত বড় পরিসরের কাঠামোগত সংস্কার চোখে পড়েনি, বরং বছরজুড়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে, নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা উচ্চ সুদহার, কম বিক্রি ও নগদ সংকটে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে সীমিত অগ্রগতি দেখা গেছে সেটি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রবাসী আয় বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরেছে, ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রণমূলক কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অগ্রগতির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে খুব একটা প্রতিফলিত হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিয়েছে, ফলে ভোগব্যয় সংকুচিত হয়েছে। বাজারে চাহিদা বাড়েনি, অর্থনৈতিক গতি ফিরে আসেনি।
২০২৫ সালে বেসরকারি খাত স্মরণকালের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বহু শিল্পকারখানা বন্ধ বা বন্ধের পথে, অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এলসি সমস্যা, জ্বালানি সংকট, বিদেশি বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার জটিলতাও ব্যবসা পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ব্যাংক খাত ছিল এ বছরের অন্যতম বড় উদ্বেগের জায়গা। রপ্তানি খাতেও ছিল দৃশ্যমান ধীরগতি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের প্রভাবে রপ্তানি আয় কমেছে।
ফলে এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয় না। নির্বাচন পূর্ব সহিংসতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে, ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চাপ কমে। সরকারের উচিত ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়ী আস্থার পুনর্গঠন, অর্থাৎ কর ও রাজস্ব নীতির নির্দিষ্টতা, খরচ নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা বাড়ানো। নির্বাচনের আগে সবচেয়ে জরুরি হলো আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ উন্নয়ন, মুদ্রাস্ফীতি ও জ্বালানি স্থিতিশীলকরণ, এবং ব্যবসায়ী আস্থা প্রতিষ্ঠা এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবে নেওয়া হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আনা সহজ হবে।
কেকে/ আরআই