১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়—একটি সময়, একটি সংগ্রাম এবং একটি বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠেছিল এদেশের সকল রাজনৈতিক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একটি নাম। দীর্ঘদিন এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ ভোরে তার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে এদেশ থেকে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেত্রী বিদায় নেননি; বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু একটি দলের প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দেননি, শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস তৈরি করেননি বরং জেল-জুলুম, মামলা-হামলা মোকাবিলা করে এবং তিনবার দেশ পরিচালনা করে এদেশের এক বিরাট আপোষহীনতার সুদূরপ্রসারী ইতিহাসকে নেতৃত্বও দিয়েছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এক কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায়, সেনাশাসন পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অগ্রভাগে। জনগণের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক শাসনের প্রশ্নে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও আপোষহীন।
বিএনপি চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি দলকে কেবল কয়েকবার বিজয়ী করে শাসন ক্ষমতার রাজনীতিতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব প্রদানে অগ্রনেতা হিসেবে ভুমিকা পালন করেননি বরং বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আরও শক্তিশালী আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতিতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ছোট বড় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথেই তার রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি ছিলেন একটি শক্তিশালী আপোষগীন কণ্ঠ। নিজ দল ছাড়াও এমনকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তার দৃঢ়তা, সাহসীকতা, সংগ্রাম, নেতৃত্বগুণ ও রাজনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করতে পারেননি—যার প্রমাণ পাওয়া যায় আজ তার ইন্তেকালে এদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের শোক ও সমবেদনায়।
রাজনীতির বাইরে তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল ত্যাগে ভরা। বেগম খালেদা জিয়ার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারানোর পর একদিকে পরিবার, অন্যদিকে রাজনীতি—দুই ভারই তাকে বহন করতে হয়েছে একা। তিনি বারবার কারাবরণ করেছেন, কারানির্যাতনের সময় দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকেছেন, চিকিৎসার অভাব এবং বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। তবুও তিনি নত স্বীকার করেননি, আপোষ করেননি এবং কখনো ভেঙে পড়েননি। তার এই বিশালতা, সহনশীলতা ও শক্তিশালী মানসিক দৃঢ়তা তাকে এদেশের দল-মত নির্বিশেষ সাধারণ মানুষের কাছে আলাদা এক অসীম শ্রদ্ধা ও মর্যাদায় তুলে ধরেছে।
মানবিক দিক থেকেও বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ব্যতিক্রমী। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাকালীন এবং অসুস্থতার সময় তার পাশে থাকা ফাতেমা বেগমের মতো মানুষের প্রতি তার স্নেহ, পারিবারিক আচরণ, আস্থা ও ভালোবাসা প্রমাণ করে—তিনি শুধু রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না, ছিলেন একজন সংবেদনশীল মানুষও। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাকে স্পর্শ করত।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অতুলনীয় সম্মানিত স্থানে। আজ তার মৃত্যুতে এই সময় বাংলাদেশের সাথে রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময় অতিক্রম করা দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকসহ বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের শোকবার্তায় তার অবদান ও ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি মিলেছে। নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তায় যেমন উঠে এসেছে—“তিনি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ ছিলেন না, আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সমমনা মিত্রগন আজ বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের শোকবার্তায় যেমন বলা হয়েছে, “স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও আধিপত্যবাদ বিরোধী রাজনীতিতে তার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।” অপরদিকে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য স্মরণীয় ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও সংগঠন পৃথকভাবে দেশনেত্রীর মৃত্যুতে শোকবার্তা প্রদান করছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বেগম জিয়ার সম্পর্কে ইতিবাচক আলোচনা এটাই প্রমাণ করে—রাজনৈতিক মতভিন্নতা সত্ত্বেও তার অবদান জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
আজকের বাংলাদেশে রাজনীতির যে দ্বন্দ্ব, সংকট, আস্থাহীনতা ও বিভাজন—তার মধ্যে দাঁড়িয়ে বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী ও ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, রাজনীতি মানে ত্যাগ, ধৈর্য ও বিশ্বাস। যেহেতু মানুষ সেহেতু তিনিও হয়তো ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন দৃঢ় অবস্থানের প্রতীক। তিনি ছিলেন সাহসীকতার প্রতীক, তিনি ছিলেন ভালবাসার প্রতীক। তার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জাতির উদ্যেশ্যে দেয়া ভাষণ, রাষ্ট্রীয় শোক, সাধারণ ছুটি ঘোষণা, জাতীয় জানাজার আয়োজন—সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ করার উদাহরণ, সবই প্রমাণ করে তিনি কেবল বিএনপির নন বরং তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন।
আজ যখন এদেশের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছে, তখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি তার রেখে যাওয়া গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের স্বপ্নকে ধারণ করতে পারব? যদি পারি, তবেই তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।
আজ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চলে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু তার নাম, সংগ্রাম, শক্তি—সবই থেকে যাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে, রাজনীতিতে এবং মানুষের স্মৃতিতে। আল্লাহ তায়ালা তাকে মাগফিরাত দান করুন এবং বেহেশত নসিব করুন। বাংলাদেশ তার অবদান চিরদিন স্মরণ করবে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ, ডীন ও চেয়ারম্যান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
কেকে/ আরআই