বিএনপি চেয়ারপারসন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তার রাজনৈতিক দৃঢ়তা, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আপসহীন অবস্থান তাকে গণমানুষের নেত্রীতে পরিণত করেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। নানাবিধ ষড়যন্ত্রে বিএনপি পড়ে যায় অথই সাগরে। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বেগম জিয়াকে দায়িত্ব নিতে হয় দলের। সেই থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নয়টি বছর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় এবং একইসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামপর্বের সূচনা হয়।
গণতন্ত্রের এ আপসহীন নেত্রী মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। মাতৃভূমির প্রতি দরদের জায়গা থেকে তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন, এ দেশের মাটিতে আমার জন্ম, মরলে দেশের মাটিতেই মৃত্যুবরণ করব।’ আল্লাহ তার মনের ইচ্ছা কবুল করেছেন।
ঢাকার রমনা বটমূলের খোলা চত্বরে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দল (বিএনপি)’ নামে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। মূলত বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমান চতুর্থ সংশোধনীর মাধমে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছিলের এটা থেকে উত্তোরণ এবং দেশবাসীর স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণে বিএনপির অভ্যুদয় ঘটে।
বিএনপির ঘোষণাপত্রে বলা হয় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইস্পাত কঠিন গণঐক্য, ব্যাপক জনভিত্তিক গণতন্ত্র ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, এক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত জনগণের অক্লান্ত প্রয়াসের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি অর্জন এবং সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ অধিপত্যবাদের বিভীষিকা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বিএনপি গঠিত হয়েছে।
১৯৭৮-এর ৩০ নভেম্বর সরকার ১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দাবিতে দুদফায় পিছিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশে এই প্রথম সব রাজনৈতিক দল ও জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং ৩৯টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ (মালেক) প্রধান বিরোধী দল হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, বিএনপির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হচ্ছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা।’
মালয়েশিয়ার ‘বিজনেস টাইমস’ লেখে, ‘অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবনী সমস্যাগুলো প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।’ এসময় নিউইয়র্ক টাইমসের বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং স্বনির্ভরতা অর্জন এবং উৎপাদন দ্বিগুণ করার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট জিয়ার অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়।
৮০ সালে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থানান্তরিত করা হয় নয়াপল্টনে। ‘১৯৮১-র ২৯ মে প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রাম সফরে গেলে ৩০ মে ভোরে সার্কিট হাউসে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য তাকে হত্যা করে। তবে নানা পদক্ষেপে ও কর্মকাণ্ডে জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের ইতিহাস হয়ে উঠেছে অভিন্ন। ব্যক্তিগত সততা, উন্নয়ন, ঐক্য এবং সুসম্পর্কের রাজনৈতিক দর্শনের কারণে রাজনীতির ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদতের পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং পরে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন এবং দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৮২-এর ২৪ মার্চ এরশাদ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মাত্র ৩ মাস আগে নির্বাচিত একটি সরকারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করে। বিএনপির কিছু নেতা এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দিলে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাত্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিতেও কিছুটা নিষ্ক্রিয়তা আসে।
কর্মীদের দাবি এবং কিছু শীর্ষ নেতার অনুরোধে ১৯৮২-এর ৩ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া দলের প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়ে গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসেন। বিএনপিকে ষড়যন্ত্র ও নিষ্ক্রিয়তা থেকে রক্ষার উদ্যোগের ফলে পার্টির সিদ্ধান্তে বেগম জিয়া ৮৩-র মার্চে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, আর শেষে চেয়ারপারসন হন। তখন তার বয়স ছিল চল্লিশের নিচে। শুরু হয় নতুন নেতৃত্বে বিএনপির পথচলা। রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক দৃঢ়চেতা, সাহসী নেত্রী। তিনিই বিপদে-দুর্যোগে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। আর শেষ জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’।
১৯৮০-এর দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সংগঠিত প্রতিবাদ ছিল ৭-দলীয় জোটের। এ জোটের নেতৃত্বে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে প্রথম বড় আন্দোলনে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৮৪ সালে আবারও গ্রেপ্তার হন। ১৯৮৭ সালে প্রায় গৃহবন্দি অবস্থায় থেকেও তিনি আন্দোলন থামতে দেননি।
ইতিহাসবিদরা বলেন, এ সময়ে কোনো সামরিক সরকারের সঙ্গে আপস না করাই ছিল তার রাজনৈতিক অবস্থানের মেরুদণ্ড। এ কারণেই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অন্যতম ‘আপসহীন নেতা’ বলে অভিহিত করেন।
১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বের মুখ। তখন দেশবাসী চাইছিল গণতন্ত্র ফিরুক, সেনাশাসনের ইতি ঘটুক। এ আন্দোলনে তিনি ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে আপস করেননি।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ব্যাপক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ফলে গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতে সর্বসম্মতিক্রমে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। তিন জোটের রূপরেখা অনুসারে ৯০ দিনের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচনে দুটি প্রধান দল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিল শেখ হাসিনা; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বে ছিল খালেদা জিয়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ৪২৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ৭৫টি দল থেকে মোট ২৭৮৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয় লাভ করে। তারা ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসন লাভ করে। বেগম খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনে জিয়ার ‘অটল অবস্থান’ এর ফল। তখনো বলা হচ্ছিল, তিনি এমন নেতা যিনি স্টেট পলিসিতে কখনো আপস করবেন না। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তিনি নানা রাজনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধের মুখোমুখি হন। বিরোধীদের দাবি, জোট রাজনীতি, এমনকি আন্তর্জাতিক মিত্রদের চাপ কোনো ক্ষেত্রেই তিনি সহজে সমঝোতায় আসেননি। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন বেগম জিয়ার ‘নীতি ও সিদ্ধান্তে কঠোরতা‘ এ সময় আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০১৩ ও ২০১৫ সালে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে সরকার ও আন্তর্জাতিক মহল তার ওপর বিভিন্ন সময় আলোচনা-সমঝোতার চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু তার দল জানিয়ে দেয়, তিনি আপসের রাজনীতি করেন না।
২০১৮ সালে শেখ হাসিনা সরকারের দেওয়া মামলায় দণ্ড পাওয়ার পর, কারাবাস ও অসুস্থতার মাঝেও তিনি সরকারের প্রস্তাবিত বিকল্প সমঝোতা গ্রহণ করেননি। এ অবস্থানেই তার ‘আপসহীন’ পরিচয় আরও প্রতিষ্ঠা পায়।
রাজনীতিতে ‘আপসহীনতা’ কারও মতে শক্তি, কারও মতে বিতর্কিত। তবে ইতিহাস বলছে, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন গড়ে উঠেছে প্রতিরোধ, সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা এবং আপস না করার নীতির ওপর।
বেগম জিয়ার মৃত্যুতে দেশবাসী আজ শোকাহত। মোটকথা সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দেশবাসীর প্রতি অগাধ ভলোবাসা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আপসহীন নেতত্ব কখনো মরে না। বেগম জিয়ার আদর্শ বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে বহমান নদীর মতো যুগ থেকে যুগান্তরে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, একেএম রহমত উল্লাহ কলেজ, ঢাকা
কেকে/ এমএস