শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিদায় ২০২৫, স্বাগত ২০২৬      ভারতের এক কূটনীতিকের সঙ্গে গোপনে বৈঠক হয়, রয়টার্সকে ডা. শফিকুর      খালেদা জিয়ার জানাজায় মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে      নির্বাচনের আগে হচ্ছে না বিশ্ব ইজতেমা, খোলা হচ্ছে প্যান্ডেল       হাদি হত্যার মূল আসামি ফয়সালের ভিডিওবার্তা এআই দিয়ে তৈরি নয়      জানাজা শেষে হেঁটে গন্তব্যে ফিরেছে মানুষ      স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মস্তক নত করেননি কভু : মহাকালের পথে মাথা উঁচু করেই বিদায় নিলেন খালেদা জিয়া
শেখ রিফাদ মাহমুদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১২:২৫ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি নিভে গেল। কনকনে শীতের সকালে যখন খবরটি ছড়িয়ে পড়ল যে, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন এবং কোটি মানুষের ভরসাস্থল ‘দেশনেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া আর নেই, তখন সমগ্র বাংলাদেশ এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল । ৮০ বছর বয়সে তাঁর এই মহাপ্রয়াণ এটি একটি যুগের সমাপ্তি, একটি ইতিহাসের পরিসমাপ্তি । তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির সেই ‘ফিনিক্স পাখি’, যিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন, স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন এবং গণতন্ত্রের জন্য নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন।  

ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর শিয়রে ছিল বড় সন্তান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা। লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, এবং হৃদরোগের সাথে দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি হার মানলেন নিয়তির কাছে । কিন্তু এই পরাজয় কেবল শরীরের; তাঁর আত্মার যে আপোষহীন দম্ভ, তা মৃত্যুঞ্জয়ী। আজ যখন জাতি শোকে মুহ্যমান, তখন আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই ১৯৪৫ সালের দিনাজপুরের শান্ত মেয়েটির দিকে, যিনি একদিন হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান ।  

গৃহকোণ থেকে রাজপথে (১৯৪৫-১৯৯০)

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ফেনীর ফুলগাজীতে, তবে বাবার কর্মস্থলের সুবাদে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে উত্তরবঙ্গের শান্ত পরিবেশে। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মা তৈয়বা মজুমদারের আদরের এই মেয়েটি ছোটবেলায় ছিলেন অত্যন্ত লাজুক ও অন্তর্মুখী। রাজনীতির উত্তাল হাওয়া তখনো তাঁর জীবনে লাগেনি। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে তাঁর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় ।  বিয়ের পর তিনি একজন সাধারণ সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে জীবন শুরু করেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। স্বামী জিয়াউর রহমান যখন চট্টগ্রামে ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, তখন খালেদা জিয়া দুই শিশু পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে ঢাকায় আটকা পড়েন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে এবং দীর্ঘ নয় মাস তিনি ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি ছিলেন। এই বন্দিজীবন ছিল তাঁর জীবনের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। সেই অল্প বয়সে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে, শত্রুবেষ্টিত অবস্থায় দুই সন্তানকে আগলে রাখার যে মানসিক দৃঢ়তা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা-ই হয়তো পরবর্তীকালে তাঁকে ‘আপোষহীন’ নেত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। 

স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান যখন সেনাপ্রধান এবং পরে রাষ্ট্রপতি হলেন, তখনও খালেদা জিয়া ছিলেন পর্দার আড়ালে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা যেত স্বামীর পাশে এক ধ্রুপদী বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে পরিমিত সাজ, স্বল্পভাষী এবং বিনয়ী। জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করলেন, তখনও খালেদা জিয়া দলের নীতিনির্ধারণী কোনো ভূমিকায় ছিলেন না। তিনি ছিলেন শুধুই ‘ফার্স্ট লেডি’, যিনি স্বামীর ছায়াসঙ্গী হয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে বেগম খালেদা জিয়ার জগতটি ওলটপালট হয়ে যায়। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। তাঁর কাঁধে তখন দুই এতিম সন্তান এবং একটি ছন্নছাড়া রাজনৈতিক দল। বিএনপির অনেক বাঘা বাঘা নেতা তখন দিগভ্রান্ত; কেউ কেউ ক্ষমতার লোভে দলত্যাগের পায়তারা করছেন। দলের প্রবীণ নেতা বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ ও বৃদ্ধ। এই ক্রান্তিলগ্নে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ছুটে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়ার কাছে। তাঁরা জানতেন, জিয়াউর রহমানের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাঁর পরিবারের কাউকেই হাল ধরতে হবে। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন । এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। গৃহকোণের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে তিনি নামলেন রাজপথের ধুলোবালিতে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা দখল করলেন, তখন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আসল পরীক্ষা শুরু হলো ।  

১৯৮২ থেকে ১৯৯০ এই নয়টি বছর ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় এবং একই সাথে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামপর্ব। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে সাধারণ রাজনীতিবিদ থেকে ‘গণমানুষের নেত্রী’তে রূপান্তর করে। এরশাদ সরকার বিভিন্ন সময় নির্বাচনের টোপ দিয়ে বিরোধী দলগুলোকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ সহ অনেক দল এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু খালেদা জিয়া ছিলেন অনড়। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়।” তাঁর এই কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি বলেছিলেন, "যারা এই নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবে" । ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তাঁর সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন ছিল প্রহসনমূলক, এবং যারা তাতে অংশ নিয়েছিল, তারা এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ করে দিয়েছিল। খালেদা জিয়ার এই একক ও সাহসী সিদ্ধান্ত তাঁকে জনগণের কাছে ‘আপোষহীন নেত্রী’ (Uncompromising Leader) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে । তিনি আপোষ করেননি ক্ষমতার লোভে, তিনি আপোষ করেননি নীতির প্রশ্নে। এরশাদ সরকার খালেদা জিয়াকে কতটা ভয় পেত, তার প্রমাণ মেলে ১৯৮৭ সালে। নভেম্বরে হোটেল পূর্বাণীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায় এবং সেখান থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে । এরপর তাঁকে বারবার তাঁর সেনানিবাসের বাসভবনে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। কিন্তু গৃহবন্দি থেকেও তিনি আন্দোলনের নির্দেশ দিয়ে গেছেন। তাঁর বাসভবনের সামনে কড়া পুলিশি পাহারা, কাঁটাতারের বেড়া কোনোকিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্ররা যখন রাজপথে নেমে আসে, তখন তাদের প্রধান স্লোগান ছিল এরশাদের পদত্যাগ। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আন্দোলনের সাথে খালেদা জিয়ার বিএনপির ৭ দলীয় জোট একাত্মতা ঘোষণা করে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন হয় এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এই বিজয় ছিল মূলত খালেদা জিয়ার আপোষহীন অবস্থানের বিজয়।  

গণতন্ত্রের নবজাগরণ ও রাষ্ট্রনায়ক খালেদা জিয়া (১৯৯১-১৯৯৬)

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাইলফলক। অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গোয়েন্দা সংস্থা ধারণা করেছিল যে, সুসংগঠিত এবং পুরনো দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সহজেই জয়লাভ করবে। কিন্তু ফলাফল সবাইকে চমকে দেয়। বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। বেগম খালেদা জিয়া নিজে পাঁচটি আসনে (বগুড়া-৭, ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, ফেনী-১, চট্টগ্রাম-৮) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং সবকটিতেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন । এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার এক অনন্য নজির। ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় আসার পর তাঁর প্রথম বড় কাজ ছিল রাষ্ট্রপতির শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া। বিএনপি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে রাষ্ট্রপতির শাসিত ব্যবস্থার পক্ষে থাকলেও, খালেদা জিয়া জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে দ্বাদশ সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস করান। ৬ আগস্ট ১৯৯১ সালে পাস হওয়া এই সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি নিজের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কমিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় ফিরে আসেন। এটি ছিল তাঁর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) সবচেয়ে বৈপ্লবিক এবং সুদূরপ্রসারী সাফল্য হলো নারী শিক্ষার প্রসার। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতিকে উন্নত করতে হলে তার অর্ধেক জনসংখ্যা অর্থাৎ নারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। 

১৯৯৪ সালে তাঁর সরকার দেশব্যাপী মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের জন্য  বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি প্রকল্প 'Female Secondary School Assistance Program (FSSAP)' চালু করে। এই প্রকল্পটি ছিল গ্রামীণ বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনের হাতিয়ার।  এই প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ এলাকার মাধ্যমিক পর্যায়ের (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) ছাত্রীদের মাসিক উপবৃত্তি প্রদান করা হতো। এর সাথে তিনটি কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল পরীক্ষায় কমপক্ষে ৪৫% নম্বর পেতে হবে, স্কুলে ৭৫% উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, এসএসসি পরীক্ষার আগে বিয়ে করা যাবে না । এই ‘বিয়ে না করার’ শর্তটি ছিল বাল্যবিবাহ রোধে এক জাদুকরী পদক্ষেপ। এর ফলে দরিদ্র পিতা-মাতারা মেয়েদের বোঝা না ভেবে সম্পদ ভাবতে শুরু করেন। যে মেয়েটিকে আগে ১২-১৩ বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া হতো, উপবৃত্তির টাকার আশায় তাকে অন্তত ১৬-১৭ বছর বয়স পর্যন্ত স্কুলে রাখা নিশ্চিত হয়।বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এই প্রকল্পের ফলে মাধ্যমিক স্কুলে মেয়েদের ভর্তির হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৩ সালে যেখানে মাধ্যমিকে মেয়েদের পাসের হার ছিল মাত্র ৩০.১১%, ১৯৯৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১.৫৮%-এ। এই উদ্যোগের ফলে কেবল শিক্ষার হার বাড়েনি, বরং তৈরি হয়েছে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত নারী, যারা পরবর্তীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, এনজিও এবং সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন। আজ যে নারী ক্ষমতায়নের গল্প আমরা বিশ্বমঞ্চে বলি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ 

খালেদা জিয়ার সরকারই বাংলাদেশে আধুনিক অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনা করে। তাঁর অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৯১ সালে ‘মূল্য সংযোজন কর’ (VAT) প্রবর্তন করা হয়। শুরুতে ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতা থাকলেও, পরবর্তীতে এটিই বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব আয়ের ওপর দাঁড়াতে শুরু করে। ২০০২-২০০৬ মেয়াদে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬ শতাংশের ওপরে ছিল।

বেগম খালেদা জিয়ার আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল টেলিযোগাযোগ খাতের একচেটিয়া বাণিজ্যের অবসান ঘটানো। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ছিল বিত্তবানদের বিলাসদ্রব্য। তৎকালীন বিএনপি নেতা মোরশেদ খানের মালিকানাধীন ‘সিটিসেল’ ছিল একমাত্র অপারেটর এবং কল রেট ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার সরকার এই মনোপলি ভাঙার উদ্যোগ নেয় এবং গ্রামীণফোনসহ অন্যান্য অপারেটরকে লাইসেন্স প্রদান করে। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হয় এবং মোবাইল ফোন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে। আজ যে রিকশাচালক বা কৃষকের হাতে মোবাইল ফোন দেখি, তার সূচনা হয়েছিল খালেদা জিয়ার এই সাহসী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। তিনি চেয়েছিলেন প্রযুক্তির সুবিধা যেন কেবল ধনীদের কুক্ষিগত না থাকে।  

তাঁর সাথে হওয়া সংঘাতময় রাজনীতি ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি

২০০১ সালের নির্বাচনে ৪ দলীয় জোট নিয়ে তিনি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। কিন্তু ২০০৬ সালে তাঁর মেয়াদের শেষে আবার রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হয়, যা ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পথ প্রশস্ত করে। এই সময় তাঁকে এবং তাঁর দুই পুত্রকে গ্রেফতার করা হয়। সংসদ ভবন এলাকায় সাব-জেলে বন্দি থাকার সময়ও তিনি ছিলেন অবিচল। তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি বলেছিলেন, “বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার সব।”

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ছিল খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত। তিনি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অনড় ছিলেন। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর তিনি 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি' বা গণতন্ত্রের অভিযাত্রার ডাক দেন। কিন্তু সরকার তাঁর গুলশানের বাসভবনের সামনে বালুর ট্রাক এবং ইটের স্তূপ রেখে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে। বাসভবনের গেটে দাঁড়িয়ে তিনি সেদিন ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন, “আমি বন্দি নই, সারা দেশই আজ কারাগারে পরিণত হয়েছে।”

২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। খালেদা জিয়া তখনো গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ। মালয়েশিয়া থেকে খবর এলো তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন । যে ছেলেটিকে তিনি ১৯৭১ সালে জেলে কোলে নিয়ে ঘুরতেন, সেই ছেলের মৃত্যুসংবাদ তাঁকে পাথর করে দেয়।  

২৭ জানুয়ারি কোকোর কফিন যখন গুলশানের কার্যালয়ে আনা হলো, তখন ‘লৌহমানবী’ খালেদা জিয়া কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছেলের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই অশ্রুসিক্ত ছবি সারা দেশের মানুষকে কাঁদিয়েছিল । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে সমবেদনা জানাতে গুলশান কার্যালয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু গেট বন্ধ থাকায় তিনি ফিরে আসেন যা দেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচারের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে । এই ঘটনা দুই নেত্রীর মধ্যকার দূরত্বকে যোজন যোজন বাড়িয়ে দেয়।  

কারাজীবন ও শেষ দিনগুলো (২০১৮-২০২৫)

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁকে রাখা হয় পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানে তিনি ছিলেন একমাত্র বন্দি। স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, ইঁদুর আর ছারপোকার উপদ্রব এমন অমানবিক পরিবেশে ৭৩ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দিন কাটত। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হয়েছে যে, কারাগারে তাঁকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি এবং 'স্লো পয়জনিং' বা ধীরলয়ে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তাঁর লিভার সিরোসিস, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং আর্থ্রাইটিসের সমস্যা কারাগারে থাকাকালেই ভয়াবহ আকার ধারণ করে ।  

২০২০ সালে করোনার সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তিনি ছিলেন কার্যত গৃহবন্দি। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পান, কিন্তু ততদিনে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছে। বিদেশে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে ।

অবশেষে, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রেখে গেলেন কোটি কোটি ভক্ত, অনুসারী এবং এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাঁর ত্যাগকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁর লিগ্যাসি তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বকীয়তাকে শক্তিশালী করেছেন। তাঁর প্রবর্তিত উপবৃত্তি প্রকল্প বাংলাদেশের নারীদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। ক্ষমতার প্রলোভন বা জেলের ভয় কোনোকিছুই তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। আজ যখন তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হচ্ছে, তখন মনে পড়ছে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি: "আমার কোনো বিদেশ নেই, এই দেশই আমার ঠিকানা। আমি যা কিছু করি, এই দেশের মানুষের জন্যই করি" । বেগম খালেদা জিয়া, আপনি শান্তিতে ঘুমান। আপনার আপোষহীন সংগ্রামের ইতিহাস এই জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। আপনার প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যে লক্ষ লক্ষ নারী আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, তারাই আপনার জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ।

বিদায়, দেশনেত্রী। বিদায়, গণতন্ত্রের জননী।

লেখক : নির্বাচিত ভিপি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  মস্তক নত করেননি কভু   মাথা উঁচু করে বিদায়   খালেদা জিয়া  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close