শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিদায় ২০২৫, স্বাগত ২০২৬      ভারতের এক কূটনীতিকের সঙ্গে গোপনে বৈঠক হয়, রয়টার্সকে ডা. শফিকুর      খালেদা জিয়ার জানাজায় মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে      নির্বাচনের আগে হচ্ছে না বিশ্ব ইজতেমা, খোলা হচ্ছে প্যান্ডেল       হাদি হত্যার মূল আসামি ফয়সালের ভিডিওবার্তা এআই দিয়ে তৈরি নয়      জানাজা শেষে হেঁটে গন্তব্যে ফিরেছে মানুষ      স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় পলিথিন বর্জ্যের রূপান্তর
মোতাহার হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৮:৩৮ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বর্তমান বাংলাদেশে পলিথিন ও প্লাস্টিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বাজার করা থেকে শুরু করে খাদ্য সংরক্ষণ, পানির বোতল, বিভিন্ন প্যাকেট ও মোড়ক সবখানেই প্লাস্টিকের আধিপত্য। ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যরে পরিমাণ। এসব বর্জ্য অপচনশীল হওয়ায় সহজে পচে না এবং দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাটি, পানি, বাতাস সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট। যথাযথ রিসাইকেল, পুনঃব্যবহার ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। ড্রেন, খাল ও নদীতে জমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে, বাড়াচ্ছে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি। কৃষিজমিতে জমে মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে এবং ভূগর্ভস্থ পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর নতুন সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছে, যা পরিবেশবাদী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

খবর অনুযায়ী, শেরপুর পৌর শহরের অষ্টম তলায় পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন করা হচ্ছে। শেরপুর পৌরসভা ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সালে এ প্রকল্পের সূচনা হয়। চলতি বছরের অক্টোবর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদন শুরু হয়েছে। স্বল্প খরচে বিভাজন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পলিথিন ও প্লাস্টিক গলিয়ে তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এ প্রক্রিয়ায় শুধু অপরিশোধিত জ্বালানি তেলই নয়, পাশাপাশি গ্যাস ও কার্বন কয়লাও উৎপাদন সম্ভব। উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে উন্নতমানের ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেন তৈরি করা যাবে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ২০০ লিটার অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। এর মধ্যে শেরপুর পৌরসভার বিনিয়োগ ৫ লাখ টাকা এবং উদ্যোক্তাদের নিজস্ব বিনিয়োগ ১৬ লাখ টাকা।

এ উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শেরপুর পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা। ২০২২ সালে পৌর শহরের অষ্টমতলায় প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা হয়। এখানে পৌর এলাকার আবর্জনা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়, যাতে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানো যায়। তবে কার্যক্রম শুরুর কিছুদিন পরই দেখা যায়, ফেলা বর্জ্যরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই অপচনশীল, যার অধিকাংশ পলিথিন ও প্লাস্টিক।

এত বিপুল পরিমাণ অপচনশীল বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের টেকসই কার্যক্রমের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তখনই বর্জ্য আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন এবং অপচনশীল পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যকে নতুনভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়। এ পর্যায়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করেন পরিবেশ ও সমাজকর্মী রাজিয়া সামাদ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পলিথিন ও প্লাস্টিক গবেষক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। যৌথ উদ্যোগ ও চুক্তির ভিত্তিতে কাজ শুরু হয়।

মাত্র ১২ থেকে ১৪ মাসের মধ্যেই পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় এ উদ্যোগ ব্যাপক আলোচনায় আসে। যে অপচনশীল বর্জ্য একসময় পৌরবাসীর কাছে ছিল বিরাট বোঝা, আজ তাই হয়ে উঠেছে জ্বালানির বিকল্প উৎস। পলিথিন গলিয়ে পাইপের মাধ্যমে তেল বের করা হচ্ছে, একইসঙ্গে উৎপন্ন হচ্ছে গ্যাস। বর্তমানে বেজওয়েল বা অপরিশোধিত তেল নিয়মিত উৎপাদিত হচ্ছে এবং রিফাইনারি মেশিন তৈরির কাজও চলমান রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এ তেল পরিশোধন করে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

চিকিৎসক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন চিকিৎসক মন্তব্য করেছেন, পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে, ভূগর্ভস্থ পানিকে বিষাক্ত করছে এবং জলজ পরিবেশ ধ্বংস করছে। এসব বর্জ্য ভেঙে তৈরি হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করে ক্যানসর, শ্বাসনালির রোগসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তার মতে, পলিথিন ধ্বংস করে জ্বালানি তেল ও গ্যাস উৎপাদন করা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ।

তিনি আরও বলেন, শুধু শেরপুর নয় রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশই অপচনশীল পলিথিন ও প্লাস্টিক। এসব বর্জ্য যদি আলাদা করে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে ডাম্পিং স্টেশনগুলো দীর্ঘদিন কার্যকর থাকবে। একইসঙ্গে পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার এবং অপচনশীল বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের মাধ্যমে বর্জ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এ প্রকল্পে সার্বিক সহযোগিতা ও অনুদান দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ সফলতার ধারাবাহিকতায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক হবে। পলিথিন ও প্লাস্টিক থেকে উৎপাদিত জ্বালানি তেল দেশের জ্বালানি খাতে ইতিবাচক অবদান রাখবে এবং আমদানিনির্ভরতা কিছুটা হলেও কমাতে সহায়ক হবে।

শেরপুরের এ উদ্যোগ প্রমাণ করেছে সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও সহযোগিতা থাকলে বর্জ্য আর বোঝা নয়, বরং আশীর্বাদে পরিণত হতে পারে। পরিবেশ রক্ষা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও শক্তি সংকট মোকাবিলায় প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় পথ। এই মডেল দেশব্যাপি বাস্তবায়ন করা গেলে তা পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক-বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  পরিবেশ   অর্থনৈতিক সম্ভাবনা   পলিথিন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close